ছোটগল্প: অরু
নানা কথা বলে লোকজন। কারও মতে এটা সরকারের নতুন নীতির পরিণতি। কারও বিশ্বাস, এ এক অলৌকিক শক্তির খেলা। আসলে এই নিস্তব্ধতার পর্দার আড়ালে আছে আরও এক গভীর সত্য। এমন এক গল্প, যা অতল অন্ধকারের বুক চিরে আমাদের
সে এক নিঃসঙ্গ শহর, যেখানে মানুষের পদধ্বনি রাস্তার ধুলোবালির সঙ্গে মিশে গেছে। একদা যে লাইব্রেরির তাকগুলো বইয়ে বোঝাই থাকত, সেখানে এখন কেবলই নৈঃশব্দ। ধুলো জমে থাকা সেলফগুলো যেন নির্বাক স্মারক, যেন বহন করছে এক বিস্মৃত সভ্যতার সাক্ষ্য। যে জানালার ফাঁক দিয়ে বইয়ের মলাটে পড়ত সূর্যের আলো, আলোর উজ্জ্বল আভায় বেজে উঠত শব্দের অনুরণন, আজ সেই জানালা রুদ্ধ। এখন সেখানে কেবলই ঘন অন্ধকার। বাতাসও যেন শিকলবন্দি। একদা এখানে অপরাহ্নের পড়ন্ত রোদ এসে ছুঁয়ে যেত পাঠকের চোখ, এক অজানা সুখের অনুভূতিতে ঢেকে যেত চারপাশ। আজ সেই রোদ নেই, আছে বিবর্ণ দেয়াল, যার গায়ে লেগে আছে পোকায় কাটা পুরনো কাগজের গন্ধ। প্রতিটি ইঞ্চি হয়ে আছে এক পরিত্যক্ত অধ্যায়ের সাক্ষী। বাতাসে বইয়ের পাতাগুলো আর উল্টে যায় না, শব্দেরা বন্দি হয়ে আছে মলাটের ভাঁজে। কেউ এসে হাত বুলিয়ে দেয় না ধুলো-মলিন মলাটে। কেউ আর পৃষ্ঠার সরল রেখাগুলোর গভীরে ডুব দেয় না। বইগুলো বড় নিঃসঙ্গ। মানুষের চেয়েও নিঃসঙ্গ। মানুষ তো কখনো কখনো স্মৃতি হাতড়ে অতীতে ফিরে তাকায়। বইগুলোর সে সুযোগ নেই। তারা প্রতীক্ষায় আছে কোনো হাতের স্পর্শের। প্রতীক্ষা ফুরায় না, পাঠকের স্পর্শ কখনো তাদের গায়ে পৌঁছায় না। সময় সেখানে জমাট বেঁধে পড়ে আছে।
কোনো একদিন হয়তো কোনো পথিক ভুল করে ঢুকে পড়বে এই নিস্তব্ধ বইয়ের রাজ্যে। ধুলো জমে থাকা মলাটের ওপর আঙুল বুলিয়ে বলবে, এখানে একসময় শব্দ ছিল, আলো ছিল, জীবন ছিল। ততদিনে শব্দেরা হয়ে যাবে আরও নির্বাক, ধুলোর স্তর আরও পুরু হবে, আর এই লাইব্রেরি চিরতরে হারিয়ে যাবে এক বিস্মৃত শহরের মানচিত্রে।
নানা কথা বলে লোকজন। কারও মতে এটা সরকারের নতুন নীতির পরিণতি। কারও বিশ্বাস, এ এক অলৌকিক শক্তির খেলা। আসলে এই নিস্তব্ধতার পর্দার আড়ালে আছে আরও এক গভীর সত্য। এমন এক গল্প, যা অতল অন্ধকারের বুক চিরে আমাদের দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। যেন এক অনুচ্চারিত পূর্বাভাস দিচ্ছে।
অরুন্ধতী, যাকে সবাই স্নেহে ‘অরু’ বলে ডাকে—সে এই ছোট শহরেরই মেয়ে। শহরটা তার বেড়ে ওঠার নীরব সাক্ষী। প্রতিদিনের আলো-ছায়ার খেলায় তার গল্প বুনে চলেছে নিঃশব্দে। যেন এক ছায়াচিত্রের গোপন ক্যানভাস। বাইরের দৃষ্টিতে শহরটি মফস্বলের চেনা ছবি। আলস্যে মোড়া দুপুর, সন্ধ্যার নিঃসঙ্গ বাতাস, দোকানের গন্ধমাখা সরু রাস্তা। কিন্তু এই শহর, এই বাড়ি, এই ইট-চুন-সুরকির আবরণে লুকিয়ে থাকা অতীত একটু অন্যরকম, একটু বেশি রঙিন, একটু বেশি রহস্যময়। অরুর পরিবার শহরটাকে এক নতুন ভাষায় পড়তে শিখিয়েছিল। বাড়ির জানালায় লতানো বেগুনি ফুল, উঠোনে ছড়িয়ে থাকা কাঠের টুকরো, মেঝেতে পড়ে থাকা আধফোটা খাতার পৃষ্ঠা—যেন এক ভিন্নতর সুর, যা কেবল তাদেরই ছিল, যে সুর কেবল তারাই বুঝত। একসময় এই শহরের বাতাসেও ছিল সেই সুরের প্রতিধ্বনি।
কিন্তু এখন? এখন শুধু নৈঃশব্দের ভার, সময়ের ফাঁক গলে নিঃশব্দে হারিয়ে যাওয়া অতীতের প্রতিচ্ছবি, যার দিকে তাকিয়ে থাকা যায়, কিন্তু তাকে ছোঁয়া যায় না। বহু বছর আগে তারা এই শহরকে আপন করে নিয়েছিল, তবুও তারা থেকে গিয়েছিল একটু আলাদা। যেন কোনো অতীতের ছায়া তাদের পেছনে পেছনে হেঁটে বেড়াত। যেন তারা শহরের শরীরে ছিল, কিন্তু আত্মগতভাবে ছিল খানিকটা দূরে।
অরুর মা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক। অবসরের পরও তাঁর কণ্ঠস্বরে বহমান ছিল প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের গভীর প্রতিধ্বনি। তাঁর উচ্চারণে কখনো কখনো অক্ষরের শরীর ছুঁয়ে বেরিয়ে আসত কোনো দূরবর্তী কালের সংলাপ, সময়ের মায়াজালে হারিয়ে যাওয়া শাস্ত্রের প্রতিধ্বনি। অন্যদিকে তার বাবা ছিলেন এক ব্যতিক্রমী বই বিক্রেতা। সাহসী, একরোখা, একরকমের নীরব বিদ্রোহী। শহরের সবচেয়ে অপ্রচলিত, সবচেয়ে রহস্যময় কোণে ছিল তাঁর বইয়ের দোকান, যে দেকানে তাকভরতি ছিল নিষিদ্ধ সব বই। এমন সব বই, যা ইতিহাসের অলিগলিতে প্রবেশ করেছিল নিষেধের তোয়াক্কা না করেই। শহরের মানুষেরা যখন চেনা গল্পের বাইরের সত্যে প্রবেশ করতে চাইত, তারা আসত সেই দোকানে। কেউ আসত কৌতূহল নিয়ে, কেউ আসত ভয়ে ভয়ে।
তাদের বাড়ি ছিল অনন্য এক জ্ঞানমন্দির। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ঠাসা বইয়ের সারি। প্রতিটি বই যেন সময়ের বুকে একেকটি প্রশস্ত পথ। একটিতে সংস্কৃত শ্লোকের শৃঙ্খলা, আরেকটিতে ইউরোপীয় বিপ্লবের জ্বলন্ত সাক্ষ্য। আবার কোনোটিতে কেবল কল্পনার সীমানাহীন বিস্তার। শুধু ভারতীয় ঐতিহ্য নয়, এই বাড়ির দেয়ালে বন্দি ছিল গোটা পৃথিবীর চিন্তা, মেধা, আর এক অদ্ভুত বিদ্রোহের স্পর্ধা। যেন বইয়ের পাতায় গড়ে উঠেছিল এক বিকল্প মহাবিশ্ব, যেখানে সত্য আর কল্পনা পাশাপাশি শ্বাস নেয়। যেখানে জ্ঞানের সীমা কেবল মলাটে আবদ্ধ ছিল না, বরং ছড়িয়ে পড়েছিল বাতাসে, আলোতে, সময়ের অলিখিত ইতিহাসে।
অরুর কাছে বই কখনোই নিছক কাগজগুচ্ছ ছিল না। তার কাছে বই ছিল জীবন্ত আত্মা, শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলা সত্তা। বাবার পুরনো কাঠের তাক থেকে গীতাঞ্জলি নামিয়ে আনলে তার মনে হতো, রবীন্দ্রনাথ যেন পাশেই বসে আছেন। গম্ভীর ও মোলায়েম কণ্ঠে তিনি শোনাচ্ছেন কবিতার শাশ্বত ধ্বনি। যেন সময়ের অতল গহ্বর থেকে কোনো এক চিরন্তন সুর ফিসফিসিয়ে ফিরে আসছে। ফকনারের দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি পড়তে পড়তে অরু অনুভব করত, যেন নিজেকে সে কুয়াশামোড়া কোনো দক্ষিণী শহরের অলিগলিতে হারিয়ে ফেলেছে, যেন এক অদৃশ্য ভারে নুয়ে পড়া অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। আর ভার্জিনিয়া উলফের টু দ্য লাইটহাউস-এর পাতায় চোখ রাখলেই মনে হতো, তার ঘরের দেয়ালে চরিত্রগুলো ছায়ার মতো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আধো অন্ধকারে তারা যেন তার কল্পনার সঙ্গে এক অলীক নৃত্যে মেতে উঠেছে।
গত বছর থেকে সবকিছুতে পড়তে শুরু করেছে এক অদ্ভুত পরিবর্তনের ছাপ। অরুর ঘরের বইগুলোও যেন নির্বাক হয়ে গেছে। একসময় যেসব শব্দ তাকে গভীর আলাপে টেনে নিত, সেসব শব্দ এখন চাপা পড়ে আছে নিস্তব্ধতার ভারে। তাক থেকে তুলে নেওয়া বইয়ের পাতাগুলো শুষ্ক, নিঃসাড়। যেন বহুদিন তারা ভাষাহীন। শব্দে আর সেই অনুরণন নেই, ছন্দে সেই পুরোনো আকর্ষণ নেই। যেন কোনো অশুভ হাওয়া ছুঁয়ে গেছে এই জীবন্ত বাড়িটিকে। চারদিকে এক স্নেহহীন নীরবতা বিরাজ করছে, যাতে লুকিয়ে আছে অন্তহীন অস্বস্তি।
কিছু একটা বদলে যাচ্ছে—নিঃশব্দে, অলক্ষ্যে। শব্দেরা যেখানে আলো ছড়াত, এখন সেখানে ছায়া দীর্ঘতর হয়। প্রতিটি তাকের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা ধূলিকণায় যেন আটকে আছে এক অজানা শঙ্কা। এক অদৃশ্য শীতল স্পর্শ যেন ধীরে ধীরে পুরো বাড়িটাকে গ্রাস করছে। অরু বুঝতে পারে না এই পরিবর্তনের উৎস কোথায়। তবে অনুভব করে, এই পরিবর্তন বা এই নীরবতা কেবল তার ঘরেই নয়, গোটা শহরের বাতাসেও ঘুরে বেড়াচ্ছে। শহরময় যেন ভেসে বেড়াচ্ছে এক বিষাক্ত ছায়া।
বইগুলো একে একে হারিয়ে যেতে লাগল। শুধু তার বাবার দোকানেই নয়, লাইব্রেরি, স্কুল, এমনকি নিজেদের বাড়ির তাকেও গ্রাস করল সেই শূন্যতার ছায়া। প্রথমে মনে হয়েছিল এ বুঝি কোনো কাকতালীয় ঘটনা। বুঝি নতুন নিয়মের ধাক্কায় কিছু বই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো এটি পরিকল্পিত এক উচ্ছেদ, এক নীরব শুদ্ধি অভিযান। শব্দদের নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে, চিন্তার শেকড় নিঃশব্দে কেটে ফেলা হচ্ছে।
একদিন সকালে সরকারি ঘোষণায় জানানো হলো, যে সাহিত্য ‘বিদ্রোহী’ বা ‘বিভাজনমূলক’ বলে বিবেচিত হবে, তা নিষিদ্ধ। সেই ঘোষণার ফলে প্রথমে বিদায় নিল জাতিগত ইতিহাসের বই। বিদায় নিল সেসব পাণ্ডুলিপি, যা অতীতের কালো দাগের কথা মনে করিয়ে দিত, ক্ষমতার চক্রান্ত উন্মোচন করত। তারপর একে একে হারিয়ে যেতে থাকল লিঙ্গ ও পরিচিতির ভিত্তিতে লেখা সাহিত্যের বইগুলো। হারিয়ে যেতে থাকল সেসব গল্পের বই, যে গল্প মানুষকে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল। পরের ধাক্কাটি এলো সেই বইগুলোর ওপর, যে বই জগতের স্বপ্নময় রূপকথায় প্রশ্ন তুলেছিল, ইতিহাসের অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা সত্যগুলোকে উন্মোচিত করতে চেয়েছিল। ধাক্কা এলো সেই গল্পগুলোর ওপর, যে গল্প মানুষকে শিখিয়েছিল ভিন্নভাবে ভাবতে, ভিন্নভাবে দেখতে।
বইয়ের মলাটের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা অক্ষরগুলো আতংকিত হয়ে পড়েছিল। প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি। ধুলোয় ঢাকা তাকের ফাঁকা জায়গাগুলো ক্রমশ আরও ফাঁকা হতে থাকল। একদিন অরু খেয়াল করল তার বাবার দোকানের সেই পুরনো কাঠের তাকগুলোর মাঝখানে এক গভীর শূন্যতা। সেসব তাকে আগে ছিল গাদা গাদা পুরনো বই, বইয়ের পাতায় পাতায় বন্দি ছিল বিপ্লবের ধ্বনি, বিতর্কের উত্তাপ ও প্রশ্নের ঝড়। এখন ফাঁকা তাক। বিবর্ণ কাঠের গভীরে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া শব্দগুলোর ছায়া লেগে আছে।
শহরজুড়ে শোনা যেতে লাগল ফিসফাস—বইগুলো কোথায় গেল? কেউ জানে না, কেউ বলতে চায় না। হয়তো সেসব বই রাতের অন্ধকারে কোনো ট্রাকে তুলে নিঃশব্দে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হয়তো গভীর বনে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হয়েছে। হয়তো বইগুলো পরিণত হয়েছে ধোঁয়ায়, ছাইয়ে, বাতাসে ছড়িয়ে পড়া বিস্মৃতির ধুলিকণায়। এক অদৃশ্য ইশারায় বইগুলো মিলিয়ে যেতে লাগল। ইতিহাসের পাতায় অদৃশ্য কালি দিয়ে লেখা হলো এক নতুন অধ্যায়। জন্ম হলো একটি শহরের, যে শহরে গল্প নেই, প্রশ্ন নেই। আছে কেবল অনুচ্চারিত শূন্যতা, আর কেবল দীর্ঘ ও অব্যক্ত নীরবতা।
অরু দেখল, তার চারপাশের বইয়ের দুনিয়া ধীরে ধীরে এক অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। যে পাতাগুলো একসময় আলো জ্বালিয়ে রেখেছিল, তারা নিভে যাচ্ছে একে একে। যেন কেউ তাদের শ্বাস রুদ্ধ করে দিচ্ছে। যেন ধীরে ধীরে কেউ শব্দের আত্মাগুলোকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে, নিঃশব্দে নির্বাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তার এই অনুভূতি এক রহস্যময় বিভ্রমের মতো। শহরটা শুধু তার চোখের সামনে থেকে মুছে যাচ্ছে না, তার স্মৃতি থেকেও ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। প্রতিটি অলিগলি, প্রতিটি পুরনো বইয়ের দোকান, ধুলোধূসরিত মলাটে মোড়ানো কাহিনিগুলো কেবল হারিয়েই যাচ্ছে না, তারা যেন এক গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তাদের আর কোনো চিহ্ন থাকবে না, কোনো স্মৃতি থাকবে না।
একসময় এই শহর অরুর কাছে জীবন্ত ছিল। গ্রীষ্মের দুপুরে ছায়াময় সরু গলি, সন্ধ্যার বাতাসে মিশে থাকা অচেনা কালি আর পুরনো কাগজের গন্ধ, বাবার বইয়ের দোকানের কাঠের তাকগুলোতে সাজানো ইতিহাস আর কল্পনার ছায়া—এসবই জীবন্ত মনে হতো। এখন সে অনুভব করে, সেই শহর আর নেই, হারিয়ে গেছে। যেন সময়ের কঠোর কুঠার এসে নিঃশব্দে তার শিকড়গুলো উপড়ে দিয়েছে, বাতাস থেকে মুছে দিয়েছে তার শব্দ, তার কণ্ঠস্বর, তার আত্মা।
বইহীন সেই শহর কি আসলেই বাস্তব? নাকি এটি তার মনের গভীরে রচিত কোনো দুঃস্বপ্ন? অরু জানে না। তবে সে অনুভব করে, এই নৈঃশব্দ, এই অনন্ত শূন্যতা তার চোখের সামনে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। ঢেকে দিচ্ছে তার পরিচিত জগতকে, গিলে ফেলছে তার শৈশব, তার সমস্ত অতীত, তার বিশ্বাস।
তার ওপর ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা। অরু খেয়াল করল, যেসব বই একসময় তার প্রিয় ছিল, সেসব বইয়ের শেষ অধ্যায়, পরিণতির মুহূর্তগুলো আর মনে পড়ছে না তার। যেন প্রতিটি গল্প অপূর্ণ, প্রতিটি চরিত্র এক অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের দিকে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে তাদের ভাগ্য অজানা ও রহস্যময়। সে যতই মনে করার চেষ্টা করে, যতই কল্পনার জাল বুনে হারিয়ে যাওয়া বাক্যগুলো খুঁজে আনতে চায়, কিছুই আর ফিরে আসে না। শব্দগুলো যেন ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেছে। ফাঁকা পৃষ্ঠার মতো স্মৃতিতে কেবলই শূন্যতা।
তখনই তার উপলব্ধি হলো, বইগুলো শুধু হারিয়েই যায়নি, তার স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে। প্রতিটি পৃষ্ঠা একে একে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। কেবল পড়ে আছে তার হাতের মুঠোয় ধরা ছায়া। সে স্পষ্ট বুঝতে পারে, এক অদৃশ্য শক্তি প্রতিটি গল্পের শেষ অধ্যায়কে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে, প্রতিটি চরিত্রের ভাগ্যকে অস্পষ্ট করে দিয়ে তাদের এক অনিশ্চিত শূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যেন বইগুলো কেবল তাক থেকে অপসৃত হয়নি, তার মনের ভেতর থেকেও বিস্ময়করভাবে একে একে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
অরুর মনে হলো, শহরটা কেবল বাইরে থেকে বদলাচ্ছে না, তার ভেতরের স্মৃতির মানচিত্রও পুনর্লিখিত হচ্ছে ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে। বইগুলোর পৃষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে শহরের আত্মা, তার পরিচয়, তার অতীত—সবই এক রহস্যময় শূন্যতায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। একদিন এই শহরের ইতিহাস ছিল, তার মানুষেরা ছিল, সেসব মানুষের গল্প ছিল। কিন্তু এখন? এখন শুধু এক দীর্ঘ, কালো নীরবতা। প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া শব্দের প্রতিধ্বনি যেন বাতাসে উড়ছে, কিন্তু শুনতে পাওয়া যায় না।
অরু একসময় নেমসেক পড়েছিল, অথচ গগলের জীবনের শেষ পরিণতি তার কিছুতেই মনে পড়ছিল না। সে যতই স্মৃতির গভীরে হাতড়ে ফিরছিল, কেবল অস্পষ্ট চিত্রগুলোই ফুটে উঠছিল। যেমন গগল দাঁড়িয়ে আছে কোথাও। হয়তো নিউ ইয়র্কের কোনো বইয়ের দোকানে, কিংবা শীতল কোনো স্টেশনের ধোঁয়াশায়। কিন্তু তারপর? তারপর কী ঘটেছিল? নাহ, মনে পড়ে না। শেষ অধ্যায় যেন কুয়াশায় ঢেকে গেছে, পৃষ্ঠাগুলো যেন মুছে গেছে তার স্মৃতি থেকে। ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিটিউড-এর ঘটনাগুলোও যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। আগে মনে পড়ত। মনে পড়ত ম্যাকোন্দোর নিঃসঙ্গ জনপদে বুয়েন্দিয়া পরিবারের দীর্ঘ ইতিহাস, উরসুলার চোখের শূন্য দৃষ্টি, জাদুবাস্তবতার আলো-অন্ধকারে ঘেরা এক শতাব্দীর কাহিনি। কিন্তু এখন? কেবলই ভাসছে অস্পষ্ট ছায়ারা, চরিত্রেরা যেন নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে, তাদের শেষ অধ্যায় সম্পূর্ণ অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।
অরু অনুভব করল তার মধ্যে স্মৃতি মুছে যাওয়ার এক অদৃশ্য খেলা চলছে। প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি কাহিনির পরিণতি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যেন তারা কখনোই পূর্ণতা পায়নি। যেন কোনো অদৃশ্য হাত গল্পের শেষ লাইনগুলো কেটে দিচ্ছে, ইতিহাসের শিরোনামগুলো মুছে দিচ্ছে, পেছনে রেখে যাচ্ছে কেবল অপূর্ণ বাক্য, অসমাপ্ত প্রসঙ্গ। অরু বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবছিল, এই নিঃশব্দ বিলোপ কি কেবল বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ, নাকি তার মনের গভীরেও এক শূন্যতার জন্ম দিচ্ছে?
এক সন্ধ্যায়, অরু যখন তার বাবা-মায়ের সঙ্গে খাবার টেবিলে বসেছিল, তখন ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছিল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। যেন চারপাশের নিস্তব্ধতায় লুকিয়ে আছে এক অজানা আশঙ্কা। বাবার এক দীর্ঘ নিঃশ্বাসে পুরো বাড়ি যেন কেঁপে উঠল। আর সেই মুহূর্তে থমকে দাঁড়াল সময়। অরু তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। যেন তিনি কিছু বলতে চাইছেন, কিন্তু শব্দগুলো তাঁর কণ্ঠে আটকে গেছে। বন্ধ দরজার ওপাশে অপেক্ষা করছে এক অনুচ্চারিত সত্য।
তার বাবা একসময় ছিলেন বইসমুদ্রের মাঝখানে এক বাতিঘর। সাহসী, স্পষ্টভাষী, আপসহীন। আজ সেই বাতিঘরের আলো যেন ক্ষীণ হয়ে এসেছে। চোখের তারায় জমাটবাঁধা ক্লান্তি, ঠোঁটের কোণে অনুচ্চারিত অস্বস্তি। শূন্য প্লেটের পাশে রাখা হাত যেন অস্পষ্টভাবে কাঁপছে। অরু অনুভব করল, বাবার নিঃশব্দ যন্ত্রণার ভার পুরো ঘরটিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। অরুর বুকের ভেতরেও এক শূন্যতা জন্ম নিল, একটা শীতল আতংক ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করতে লাগল। তার মনে হলো, তারা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে এক অনিবার্য বিনাশের দোরগোড়ায়। কী যেন হারাতে যাচ্ছে। কিন্তু কী হারাতে যাচ্ছে, তা কেউই স্পষ্ট করে বলতে পারছে না। শুধু জানে কিছু একটা নিঃশব্দে, অলক্ষ্যে, ধুলোয় ঢেকে যাওয়া তাকের মতো মুছে যাচ্ছে। শব্দের চাইতেও গভীর কিছু, যা একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না।
‘ওরা শুধু বই নিষিদ্ধ করছে না, অরু। ওরা চিন্তাকেও নিষিদ্ধ করছে’—বাবা ধীর ও শান্ত গলায় বললেন, খাবারের প্লেটটা একপাশে সরিয়ে রেখে। কথাগুলো যেন ঘরের প্রতিটি দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হলো। যেন সময়ের ওপরে খোদাই হয়ে থাকা এক সতর্কবার্তা, যা বাতাসে মিশে গেল, কিন্তু মুছে গেল না। ঘরের আলো এক মুহূর্তের জন্য ম্লান হয়ে এলো। চারপাশের নিস্তব্ধতায় এক অদৃশ্য ভারী বাতাস এসে বসে রইল অরুর মনে। সে অনুভব করল, এই নিষেধাজ্ঞা শুধুই বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এক নিঃশব্দ যুদ্ধ। শব্দদের একে একে নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে, চিন্তার দিগন্তকে সংকীর্ণ করে ফেলা হচ্ছে, যেন কেউ আর প্রশ্ন তুলতে না পারে।
বাবার চোখের গভীরে একটা দুঃসহ বেদনা ছিল, এক অন্তর্নিহিত ক্ষোভ ছিল। যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো শহরের কুয়াশাচ্ছন্ন প্রতিচ্ছবি, যা একসময় প্রাণবন্ত ছিল। অরু বুঝতে পারল, এই হারিয়ে যাওয়া শহর আসলে একটা সময়, একটা আদর্শ, একটা মুক্ত বাতাস—এখন যার শ্বাস ক্রমশই রুদ্ধ হয়ে আসছে। তা এমন এক বাস্তবতা, যেখানে মানুষ আর নিজের ভাবনার মালিক থাকবে না। সেখানে শব্দ থাকবে, কিন্তু শব্দের অর্থ থাকবে না। সেখানে আলো থাকবে, কিন্তু তার উষ্ণতা থাকবে না। এই যুদ্ধটা শুধুই নিষিদ্ধ বইয়ের নয়, যুদ্ধটা অস্তিত্বের, ইতিহাসের, সত্যের।
অরুর ভেতরে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে লাগল এই ভয়, এই শহর কি একদিন এতটাই নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে যে কেউ আর জানবেও না এখানে একসময় গল্প ছিল, প্রশ্ন ছিল, আলো ছিল? নাকি সবকিছু হারিয়ে যাওয়ার আগে সে কিছু করতে পারবে?
তার মা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে চশমা ঠিক করে বললেন, ‘ভারতের এক পুরনো গল্প আছে। এক সময়, যখন রাজারা বিদ্রোহের ভয়ে তটস্থ থাকত, তখন শুধু বই পোড়ানোই যথেষ্ট ছিল না, তারা আহ্বান করত এক অভিশপ্ত বাতাসকে, যাকে বলে বায়ুপুস্তক, ভুলে যাওয়ার হাওয়া। সেই বাতাস ছুটে বেড়াত গ্রাম থেকে গ্রামে, নগর থেকে নগরে। মুছে দিত কিছু বিশেষ গল্প, কিছু বিশেষ সত্য। মানুষ জানতেও পারত না কী হারিয়ে গেল। কোন কথা, কোন ইতিহাস তাদের স্মৃতি থেকে চিরতরে বিলীন হয়ে গেল। যেন ইতিহাস নিজেই নতুন করে লিখিত হতো, আর মানুষ ভুলে যেত নিজেদের প্রকৃত অতীত।’
এক শীতল শিহরণ বয়ে গেল অরুর শিরদাঁড়ায়। সত্যিই কি এমন কিছু সম্ভব? আধুনিক এই শহরে কি সেই অশুভ বায়ুপুস্তক আবার ফিরে আসতে পারে? তার যুক্তিবাদী মন বারবার একে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও মনের গভীরে কোথাও যেন এক পুরনো ভয়ের ছায়া দোলা দিচ্ছিল। সেই ভয় যুক্তির সমস্ত অস্তিত্বকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছিল, যেন অদৃশ্য কোনো আতংক মনের ভেতর নিঃশব্দে জন্ম নিচ্ছিল। অরু বুঝতে পারল, এই আশঙ্কা কেবল কল্পনা নয়, বরং তার ভেতরের গভীর এক সত্যের প্রতিচ্ছবি। সেই শঙ্কা জানান দিচ্ছিল অন্ধকার কখনোই পুরোপুরি মুছে যায় না, কেবল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন রূপে, নতুন পথে ফিরে আসে।
দোকানের বাতাস যেন অদৃশ্য এক অতীতের ওজন নিয়ে স্থির হয়ে আছে। সময় এখানে প্রবাহমান নয়, স্তব্ধ। এক নিঃশব্দ স্মৃতিস্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে তাকের সারি। যেখানে একদা শব্দেরা ফিসফিস করে কথা বলত, সেখানে এখন কেবলই জমে থাকা ধুলো। যেন নির্বাক সাক্ষী। অরু ধুলোয় মলিন তাকগুলোর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, একসময় যেসব বইয়ের গন্ধে এই দোকান ভরপুর ছিল, এখন তার বুক জুড়ে শুধুই নীরবতা, চাপা দীর্ঘশ্বাস।
কোণার ধুলোমাখা তাকের নিচে চাপা পড়ে থাকা পাতলা বইটি নিজে থেকেই তার চোখে ধরা দিল। যেন কালের গভীর থেকে কেউ তাকে ডেকে পাঠাচ্ছে। অরু ধীরে ধীরে বইটা তুলে নিল। স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গেই তার শিরদাঁড়া বেয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। এক ঠান্ডা স্পর্শ। যেন অতীতের কোনো ছায়া তার ত্বকের নিচে ঢুকে পড়ল। এক বিস্ময় অপেক্ষা করছিল তার জন্য। মলাটের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা পাতাগুলো খুলতেই বেরিয়ে এলো সেই বিস্ময়। প্রথমে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। পাতাগুলো ছিল ফাঁকা, বিবর্ণ, মৃত। মুহূর্তেই যেন অদৃশ্য এক হাত বইয়ের বুকে শব্দ ফুটিয়ে তুলতে লাগল। প্রাচীন, বিস্মৃত কিছু অক্ষর—যা সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, যা কারও মনে পড়ার কথা ছিল না। অরু মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। চোখের সামনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল এক অভূতপূর্ব বার্তা : ‘তোমার জানা সত্য নয়, তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক বিস্মৃত কাহিনি।’
এই বার্তা যেন গোপন ইতিহাসের নিঃশব্দ আহ্বান। যেন এমন এক সত্য, যা ভুলে যাওয়া হয়নি, বরং ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক অজানা শঙ্কায় বুক ধক করে উঠল অরুর। এ বই কি কেবল কাগজ আর কালির সমষ্টি, নাকি এর ভেতর লুকিয়ে আছে এমন কিছু, যা তার অস্তিত্বকেই বদলে দেবে? শহরের বাতাসে এখনো কি সেই নিষিদ্ধ বায়ুপুস্তক-এর গন্ধ ভাসছে? সময় কি সত্যিই এক নিরীহ প্রবাহ, নাকি কোনো এক অদৃশ্য শক্তি সেটাকে ইচ্ছেমতো লিখে মুছে আবার নতুন করে সৃষ্টি করে? অরু জানে না। সে অনুভব করল, বইটা শুধু অতীতের নয়, বরং তার ভবিষ্যতেরও চাবিকাঠি। ভুলে যাওয়ার বাতাস আবার ফিরে এসেছে, কিন্তু কেউ একজন কিছুই ভুলবে না, সব মনে মনে রাখবে।
শব্দগুলো পৃষ্ঠার ওপর ছায়ার মতো নড়ছে, ফিসফিস করে উঠে আসছে অদৃশ্য কণ্ঠস্বর। অরুর বুকের ভেতর একটা শূন্যতা দুলে উঠল। এই শব্দ কি শুধুই কালি আর কাগজের খেলা, নাকি এরা জীবন্ত? পৃষ্ঠার এই কথারা কি তার কাছে কিছু বলতে চাইছে? ভুলে যাওয়ার বিপরীতে তার কি কোনো দায় নেই? সে তাকিয়ে থাকে। অনুভব করে ভেতরে অদ্ভুত এক শীতলতা ছড়িয়ে পড়ছে। আলো-বাতাস না ঢোকা সুড়ঙ্গের শীতলার মতো। যেন কোনো প্রাচীন সাবধানবাণী লুকিয়ে আছে শব্দের রেখায়। লুকিয়ে আছে ভুলে যাওয়া এক দুঃস্বপ্ন, যা সত্যের চেয়েও বেশি বাস্তব। কিন্তু যদি কেউ তাকে মনে রাখে, তাহলে কি সে পালাতে পারবে?
অরুর শরীর ঝিম ধরে আসে। বইয়ের পাতায় শব্দেরা নিজছন্দে দুলছে। সেই দোলায় এক অদৃশ্য ভয় অরুর মেরুদণ্ডের নিচে নেমে আসে। গল্পটা এখনো শেষ হয়নি, অথচ বইয়ের দোকানের বাতাস বদলে গেছে। জানালাগুলো বন্ধ, দরজাও শক্ত করে আটকানো, তবু কোথাও যেন একটা পথ খোলা, যেখান দিয়ে প্রবেশ করেছে এক বিস্মৃত অতীতের গন্ধ। সেই বাতাসে মিশে আছে শুকিয়ে যাওয়া অরণ্যের শীতলতা, ধুলোবালি হয়ে যাওয়া কাহিনির আবেশ, কোনো এক হারিয়ে যাওয়া জীবনের অবশেষ। যেন কেউ এসে দাঁড়িয়েছে তার পেছনে। সে ঘুরে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। অরুর মনে হলো, বাতাসের প্রতিটি তরঙ্গ তার চারপাশ থেকে চেনা পৃথিবীর রেখা মুছে দিচ্ছে, যেন দৃশ্যমান বাস্তবতাকে ধীরে ধীরে শুষে নিচ্ছে এক অদৃশ্য শূন্যতা। দোকানের তাকে সাজানো গল্পগুলোও ফিকে হয়ে আসছে, যেন শব্দের শরীর থেকে রং চুইয়ে পড়ছে। বাতাসের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অশুভ অনুজ্ঞার অস্তিত্ব সে স্পষ্ট টের পায়। টের পায় এক নিঃশব্দ ধ্বংস, যা ধীরে ধীরে তার চারপাশের ছায়াগুলোকে গিলে নিচ্ছে। তার মনে হলো, এই মুহূর্তে যদি সে ঘুরে তাকায়, ঠিক তখনই দেখবে কেউ একজন ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়ে। সে নিঃশ্বাস ফেলছে এক অস্বাভাবিক ছন্দে। সেই নিশ্বাসের প্রতিটি ওঠানামা যেন এই ঘরের বদ্ধ বাতাসের গতিপথ বদলে দিচ্ছে।
অরু হঠাৎ বুকের কাছে বইটা শক্ত করে চেপে ধরে ছুটতে শুরু করল। পা দুটো যেন মাটি ছুঁতে চাইছে না। দৌড়ানোর আতংক এতটাই প্রবল যে তার নিঃশ্বাসে ছন্দহীনতা এলো। দরজার সামনে এসে এক ঝটকায় দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল। যেন বাইরে থাকা কিছু তার পেছন পেছন ছুটে আসছে। বারান্দায় মা-বাবা বসে ছিলেন। বাবার হাতে চায়ের কাপ, মায়ের হাতে সেলাই। যেন এক স্থিরচিত্র, যেখানে কেবল বাতাসের অস্থিরতা ছাড়া কিছুই নড়ছে না। অরু একটা কথাও না বলে বইটি বাড়িয়ে ধরল। আর সেই মুহূর্তেই চারপাশের শব্দ থেমে গেল, সময় স্থির হয়ে পড়ল। বাবার চোখের গভীরে এক ঝলক আতংক খেলে গেল। এক মুহূর্তের জন্য যেন একটা পুরনো স্মৃতি তাকে ছুঁয়ে ফেলে আবার মিলিয়ে গেল। মা স্থির চোখে তাকিয়ে আছেন। তার কপালের ভাঁজ গভীরতর হয়, দৃষ্টি নামতে থাকে তার বুকে। যেন এক পুরনো, বিস্মৃত আশঙ্কা আবার জেগে উঠছে। বাবা ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে বইটা নিলেন, পাতার উপর হাত বুলালেন। যেন শব্দের তলায় লুকিয়ে থাকা কিছু অনুভব করছেন তিনি। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একট ক্লান্ত ও ভারী শ্বাস। যেন এ বইয়ের ভেতর শব্দ নয়, আছে এক বিস্মৃত অতীতের প্রতিধ্বনি।
অরুর মনে হলো, সে শুধু একটা বই নয়, একটা অজানা কিছু নিয়ে এসেছে। এমন কিছু, যা এই ঘরের নীরবতাকে বিদীর্ণ করতে পারে, তাদের অতীতকে উল্টে দিতে পারে। সে জানে না এই গল্পের শেষ কোথায়, বা আদৌ শেষ আছে কিনা।
‘এটা কোনো সাধারণ বই নয়’—বাবার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। যেন শব্দের ভারেই গলা আটকে আসছে। ‘এটা স্মৃতির বই। যেসব গল্প হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেসব গল্পের বই।’
শব্দের গভীরে যেন এক অদ্ভুত কম্পন, বিস্ময় আর ভয়ের মিশেলে তৈরি এক অনিশ্চিত ছায়া। অরু কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল। বুকের মধ্যে কোথাও একটা ভারী শূন্যতা দুলছে, ধীরে ধীরে জমাট বাঁধছে এক অব্যক্ত অস্বস্তি। এই পাতাগুলো শুধু গল্প নয়, বরং এমন এক সময়ের চিহ্ন, যা বহুদিন ধরে মুছে ফেলার চেষ্টা চলেছে। এক বিস্মৃত অতীতের নিঃশ্বাস হয়তো এই মলাটের ভেতরে আটকে ছিল এতদিন। অরু বুঝতে পারে না বাবার চোখে এত অজানা আতংক কেন। মা নিশ্চুপ। তার দৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকা স্তব্ধতা বলে দিচ্ছে তিনি জানেন। জানেন বইটা যে শুধুই মলাটবন্দি কাগজের সমষ্টি নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া এক শহরের, এক সময়ের, এক অস্তিত্বের প্রতিধ্বনি। অরুর মনে হলো, সে হয়তো এমন এক সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যার অর্থ জানা মানেই বিপদের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
সেই রাতে অরুর চোখে ঘুম এল না। বিছানার পাশে বইটা পড়ে আছে নিঃশব্দে, অথচ তার চারপাশের বাতাসে যেন এক চাপা শব্দের তরঙ্গ খেলে যাচ্ছে। চাঁদের ম্লান আলোয় পাতার ওপর এক ছায়াচিহ্ন পড়েছে। যেন এক অতীন্দ্রিয় আলোর আভাস। রাতে সে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল : চারপাশ থেকে পুরনো কণ্ঠস্বরেরা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে, ফিসফিস করে কিছু বলছে। বলছে এমন সব গল্পের কথা, যা সে একসময় জানত, অথচ এখন আর মনে করতে পারে না। শব্দগুলো ভাসছে বাতাসে, এক প্রাচীন ভাষায়, যে ভাষা তার অজানা, অথচ মনে হচ্ছিল পরিচিত। স্বপ্নের গহ্বরে তলিয়ে যেতে যেতে তার মনে হলো, শব্দগুলো তাকে কিছু জানাতে চাইছে, তাকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চাইছে। ভুলে যাওয়া সেই কাহিনিগুলো যেন মনের অতল থেকে পুনরুজ্জীবিত হতে চাইছে, অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে আসতে চাইছে।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই অরুর মনে হলো, যেন এক প্রবল সত্য তাকে স্পর্শ করে গেছে। সে জানে তাকে কী করতে হবে। রাতের ফিসফিসানি, বইয়ের পাতায় ছড়িয়ে থাকা অদৃশ্য শব্দ, মায়ের বলা পুরনো গল্প—সব কিছু এক বিন্দুতে গিয়ে মিশেছে। তার সামনে খুলে দিয়েছে এক অনিবার্য পথ। বইটির সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া কাহিনিগুলোর এক গভীর যোগ আছে। কাহিনগুলোকে উদ্ধার করা যেন তারই দায়িত্ব। শব্দগুলো তাকে ডাকছে, স্মৃতির অন্ধকার থেকে ফিরে আসতে চাইছে। অরু যেন একমাত্র সেতু, যা তাদের আলোর পথে নিয়ে যেতে পারে। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। এক অজানা সাহস তার শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সেই সাহস প্রতিজ্ঞার মতো শক্ত, বাতাসের মতো অদৃশ্য।
বইয়ের দোকানটা আর শুধুই দোকান নয়, তার দেয়ালের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গোপন প্রকোষ্ঠ, হারিয়ে যাওয়া বইয়ের ঘর। বাবা-মা তাকে কখনোই এই ঘরের কথা বলেননি। আজ যেন দেয়ালের প্রতিটি ইট, প্রতিটি শীতল আভা তাকে ডেকে নিচ্ছে ভেতরের সেই বিস্মৃত দুনিয়ায়। পেছনের দিকে একটা মরচে ধরা পুরনো দরজা, এতদিন যা ছিল দৃষ্টির আড়ালে। দরজাটা যেন নিজেই তার জন্য খুলে যাচ্ছে, ফিসফিস করে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে এক বিস্তৃত জগতে, যা বাস্তবতা আর কল্পনার সীমারেখায় ঝুলে আছে।
অরু পা রাখল সেই ঘরে। সঙ্গে সঙ্গেই তার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেল। ঘরটি দোকানের আকারের চেয়ে বহুগুণ বড়। যেন এক রহস্যময় কুঠুরি, যা সময়ের নিয়ম মানে না। তাকগুলোতে স্তূপাকৃত বইগুলো কখনো বিবর্ণ হচ্ছে, আবার কখনো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে এক অনির্বচনীয় জীবন্ত অস্তিত্ব নিয়ে, যা একসঙ্গে টিকে আছে অতীত, বর্তমান আর এক অদেখা ভবিষ্যতে। ঘরের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি ধুলোবালি জমা তাক, প্রতিটি মলাট যেন এক মৌন ভাষায় কথা বলছে। চারদিকে ভুলে যাওয়া, চেপে রাখা, মুছে দেওয়া কাহিনির ফিসফিসানি। অরু তাকিয়ে থাকে। অনুভব করে, এই ঘরের প্রতিটি বই তার জন্যই অপেক্ষা করছে। যেন সে-ই তাদের একমাত্র স্মৃতির রক্ষক, তাদের গল্প ফিরে পাওয়ার শেষ সুযোগ।
ঘরের মাঝখানে ছিল একটি আয়না। কোনো সাধারণ আয়না নয়। এর কাচের গভীরে যেন লুকিয়ে ছিল এক বিস্মৃত সময়ের প্রবেশদ্বার। অরু যখন ধীরে ধীরে আয়নাটির সামনে এগিয়ে গেল, তখন এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠবে। অথচ না, কোনো প্রতিচ্ছবি দেখা গেল না। বরং সে যা পড়েছিল, সেসব গল্পের ছায়া ধীরে ধীরে ভেসে উঠল। প্রথমে অস্পষ্ট, তারপর স্পষ্ট হয়ে উঠল : একটি গ্রাম, যেখানে কেউ অপেক্ষা করছে। একটি শহর, যা একদিন আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। কিংবা এক পরিচিত চরিত্র, যে এতদিন বইয়ের পাতায় আটকে ছিল। প্রতিটি গল্পের অংশ, প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি বিস্মৃত স্মৃতি আয়নার কুয়াশাচ্ছন্ন কাঁচে ধরা পড়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। যেন সময়ের রেখা ধরে তারা ধুলো হয়ে উড়ে যাচ্ছে।
অরু তাকিয়ে রইল। বিস্ময়ে তার শ্বাস ভারী হয়ে এলো। গল্পগুলো শুধু পড়ার জন্য নয়, তারা যেন তার চারপাশের বাস্তবতারই অংশ হয়ে উঠছে। এমনই বাস্তব, হাত বাড়ালেই যা ছুঁতে পারবে। তারা কথা বলতে পারবে তার সঙ্গে। তাদের কষ্ট, আনন্দ ও বিস্ময়ের অনুভূতি বোঝাতে পারবে।
অরু তখনই উপলব্ধি করল, এই আয়না কেবল স্মৃতি ধরে রাখার জন্য নয়, এটি এক রক্ষক, এক প্রতিচ্ছবি, যা হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলোকে জীবিত রাখে। গল্পগুলো কখনোই হারায়নি, তারা এখানে বন্দি, সময়ের সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে কেউ তাদের আবার স্মরণ করবে বলে, আবার জাগিয়ে তুলবে বলে। প্রতিটি গল্প যেন একেকটি অবরুদ্ধ আত্মা, যারা রয়েছে মুক্তির প্রতীক্ষায়।
অরুর রক্তে ছড়িয়ে পড়ল এক হিম শিহরণ। এই ঘর, এই আয়না তাকে এক গভীর দায়িত্বের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, এক অদৃশ্য শপথের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সে কি এসব বিস্মৃত কাহিনি সত্যিই হারিয়ে যেতে দেবে? নাকি তাদের স্মৃতির অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে এনে নতুন আলো দেবে?
আয়নার কুয়াশার ওপারে কারও ফিসফিসানি যেন শোনা গেল। অনুনয়ের এক ছায়া ছড়িয়ে পড়ল। অরু অনুভব করল, এটি শুধুই গল্প নয়, এটি তার কাছে ফেরা এক অতীত, যা ভুলে যাওয়ার জন্য নয়, বরং মনে রাখার জন্য অপেক্ষা করছে।
অরু ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে আয়নার ঠান্ডা কাচ স্পর্শ করল। মুহূর্তেই চারপাশের বাতাস কাঁপতে শুরু করল। যেন ঘরটা এক রহস্যময় শ্বাস ফেলে তার উপস্থিতিকে স্বীকার করছে। হঠাৎ চারপাশের তাকভর্তি বইগুলো জীবন্ত হয়ে উঠল। পাতাগুলো নিজে নিজেই উল্টে যেতে লাগল। শব্দেরা বাতাসে ভেসে উঠল। মুক্তির আনন্দে উন্মত্ত নাচের মতো ছড়িয়ে পড়ল ঘরের কোণে কোণে।
হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলো আবার ফিরে আসছিল শুধু অরুর জন্য নয়, বাইরের দুনিয়ার জন্যও। শব্দের গুঞ্জনে অতীত ও বর্তমানের সীমারেখা যেন ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল। অরু অনুভব করল, তার স্পর্শেই যেন এই গল্পগুলো নতুন করে দেহ ফিরে পাচ্ছে। তারা আর নিছক কালি ও কাগজের বন্ধনে আবদ্ধ নেই, তারা শ্বাস নিচ্ছে, কথা বলছে, নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে। প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া কাহিনি, যেগুলো একসময় ইতিহাসের ধুলোয় চাপা পড়ে যাওয়ার কথা ছিল, তারা আবার ফিরে আসছে তাদের সত্য ও শক্তি নিয়ে পৃথিবীকে জানান দিতে।
সেই মুহূর্তেই অরুর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল। সে ভাবল, সব গল্প কি মনে রাখা উচিত? কিছু গল্পের শক্তি এমন যে, যা মানুষের বোঝার ক্ষমতার বাইরের কিছু সত্যকে বহন করে। কিছু গল্প অতীতের এমন ভুল, যা প্রকাশ পাওয়া মানেই নতুন বিপদের জন্ম দেওয়া। আর কিছু গল্প এমনও আছে, যেগুলো ভুলে যাওয়ার কথা ছিল। কারণ তাদের মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন এক অন্ধকার, যা বর্তমানের উপযোগী নয়।
অরুর মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে এলো। তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন গল্পগুলো মুক্তি পাবে, আর কোন গল্পগুলো চিরতরে নীরবতার ঘেরাটোপে বন্দি থাকবে। এই সিদ্ধান্ত শুধু তার নয়, এই গল্পগুলোর ভবিষ্যতও নির্ধারণ করবে।
আর ঠিক তখনই আয়নাটা ফেটে গেল। এক প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে ছিটকে পড়ল মেঝেতে। ভাঙা টুকরোগুলো থেকে বের হলো এক অন্ধকার শক্তি, প্রাচীন ও বদ্ধ এক দীর্ঘশ্বাস, যা এতদিন ধরে মুক্তির অপেক্ষায় ছিল। ঘরের আলো ক্ষীণ হয়ে এলো, দেয়ালগুলোর ছায়া দীর্ঘতর হয়ে উঠল, আর প্রতিটি কাচের টুকরো আলাদা আলাদা গল্পের প্রতিচ্ছবি ধারণ করল। সেই প্রতিচ্ছবি অপূর্ণ, অস্থির এবং কিছুটা ভীতিকরও।
অরু দেখল, কাহিনিগুলো আর আগের মতো নেই। তারা বদলে গেছে। তারা এখন আরও গভীর, আরও অমোঘ, আরও রহস্যময়। কিছু কাহিনি অন্ধকারে দুলছে, আয়নার টুকরোতে কিছু কাহিনির মুখ ফুটে উঠছে। কিছু শব্দ আকার নিচ্ছে, কিন্তু অর্থ বোঝা যাচ্ছে না।
অরু দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে। আয়নার ভাঙা কাচের টুকরোয় প্রতিফলিত তার নিজের মুখ যেন এক নতুন গল্প হয়ে উঠেছে। এমন এক গল্প, যার শেষ কী হবে, তা এখনও কেউ জানে না।
অরু এক পা পিছিয়ে এলো। সে জানত এই গল্পগুলোর ভার এখন তার হাতে। আয়নার ভাঙা টুকরোগুলো নিথর পড়ে আছে। প্রতিটি টুকরোর মধ্যে আটকে থাকা কাহিনিগুলো যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে। যেন অপেক্ষায় আছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের—অরু কি তাদের মুক্তি দেবে? নাকি চিরতরে বন্দি রাখবে?
তারপর নীরবতা। ঘরটা মুহূর্তেই এক শূন্যতার অতলে ডুবে গেল। বাতাস ভারী হয়ে এলো। যেন সময় থমকে গেছে, সব শব্দ নিঃশেষ হয়ে গেছে। অন্ধকার শক্তির কণাগুলো বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল, ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল কোনো এক অজানা দিগন্তের দিকে। তাকভর্তি বইগুলোও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন তারাও অপেক্ষায় আছে। কিন্তু কার জন্য অপেক্ষা, তা কেউ জানে না। অরু তাকিয়ে রইল সেই নিস্তব্ধতার দিকে, এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর শূন্যতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তার চারপাশের পৃথিবী বদলে গেছে। এক মুহূর্ত আগেও যা ছিল, এখন তা বাস্তব না কল্পনা, আলাদা করা মুশকিল।
শহরের কেউ আর কখনো অরুকে দেখেনি।
বইয়ের দোকানটা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। দোকানের জানালায় জমে থাকা ধুলো ক্রমশ ঢেকে দিল সব স্মৃতি, সব চিহ্ন। দোকানের ভেতরে থাকা বইগুলোর গল্পগুলোও মুছে যেতে লাগল শহরের মানুষের মন থেকে, ঠিক যেমন করে একদিন এই গল্পগুলো হারিয়ে গিয়েছিল। সময়ের ভারে সেই কাহিনিগুলো আবার নীরব হয়ে গেল, অন্ধকারে ঢেকে গেল চিরতরে। আর কেউ কখনো জানতে পারল না সেই ফাটা আয়নার গল্প। শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে ভুলে গেল অরুর নাম, ভুলে গেল সেই দোকান, ভুলে গেল তার বইয়ের তাক। ভুলে গেল সেই সব গল্প, যেগুলো একসময় মুক্তি চেয়েছিল।
কিন্তু মাঝেমধ্যে, নিস্তব্ধ রাতে, বাতাস যখন নিঃশব্দে ফিসফিসিয়ে বইতে শুরু করে, তখন কেউ কেউ বলে যে, তারা পাতার ফড়ফড় শব্দ শুনতে পায়, হারিয়ে যাওয়া সেই গল্পগুলোর মতো, যেগুলো এখনো অপেক্ষায় আছে। কেউ যদি সাহস করে রাতের গভীরে হারিয়ে যাওয়া সেই দোকানটিকে খুঁজতে বের হয়, হয়তো তারা সেই অমীমাংসিত গল্পগুলো, সেই চাপাপড়া সত্যগুলো খুঁজে পেতে পারে। বাতাসে ভেসে থাকা সেই শব্দগুলো হয়তো শুধুই কল্পনা, অথবা সত্যের এক দীর্ঘশ্বাস, অপেক্ষায় থাকা কিছু বিস্মৃত কাহিনির, যা নিজেকে প্রকাশ করতে চায়।
কিন্তু অরুর কী হলো? তার পরিণতি থেকে গেল রহস্যের এক অতল অন্ধকারে। তা এক এমন সত্য, যা ভুলে যাওয়ার বাতাস কখনোই প্রকাশ করবে না। তার অস্তিত্ব কি মিশে গেছে সেই হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলোর ভেতর? নাকি সে নিজেই হয়ে উঠেছে এক চিরকালীন কাহিনি, যে কাহিনি আর কেউ পড়বে না, কেউ জানবে না, অথচ যার উপস্থিতি বাতাসের অলক্ষ্য স্রোতের মতো অনুভব করা যায়। অরু কি গল্পগুলোর রক্ষক হয়ে নিজেই তাদের অংশ হয়ে গেছে? নাকি বাস্তবতার কোনও সীমারেখা পেরিয়ে এক সম্পূর্ণ অন্যতর জগতে হারিয়ে গেছে, যেখানে ভুলে যাওয়া গল্পেরা অপেক্ষা করে, যেখানে শব্দেরা নিঃশব্দে শ্বাস ফেলে?
এসব প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই। শুধু নীরবতার গহীনে রয়ে গেছে ফিসফিসানি, এক দূরবর্তী প্রতিধ্বনি, যা কেবল সাহসী হৃদয়ের ভেতর ধ্বনিত হয়, যদি কেউ তাকে খুঁজতে চায়।
এই শহরের মানুষ আজ আর কিছুই জানে না। কিন্তু অরুর বাবা-মা জানতেন। তারা জানতেন যে, হারিয়ে যাওয়া সেই আয়নার ভাঙা টুকরোগুলো এখনও কোথাও রয়ে গেছে গোপনে, নীরবে। জানতেন, সেই কাচের প্রতিফলনে এখনও আটকে আছে এমন সব গল্প, যেগুলো পৃথিবীর বাকি মানুষদের মন থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল। তারা বুঝতেন, কিছু গল্প এতটাই গভীর ও এতটাই তীব্র যে, তা মানুষের সামনে কখনোই প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল না। আর সেই রহস্যময় টানটাই হয়তো অরুর শেষ পরিণতি নির্ধারণ করেছিল। শহরকে রক্ষা করতে গিয়ে সে নিজেই হয়ে উঠল এক হারিয়ে যাওয়া কাহিনির অংশ, এক অমীমাংসিত ধাঁধার ভেতর বিলীন হয়ে গেল চিরতরে। এইভাবে সে বাঁচিয়ে রাখল তার শহরকে, অথচ নিজেই হারিয়ে গেল সেই গল্পগুলোর মলিন পাতায়, যেখানে স্মৃতি তলিয়ে যায় সময়ের অতলে, কিন্তু কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না।
তবে কি এই কাহিনি সত্যিই শেষ?
কিন্তু ভুলে যাওয়া বাতাস যদি আবার ফিরে আসে, যদি সেই হারিয়ে যাওয়া আয়না কখনো আরেকবার নিজেকে গড়ে তোলে, তবে কি সেই চাপাপড়া সত্যগুলো আবার আলোর মুখ দেখবে? অরুর আত্মত্যাগ, তার হারিয়ে যাওয়া কাহিনি, সেই সমস্ত গল্প, যা একসময় নিঃশব্দে গুম করে দেওয়া হয়েছিল, তারা কি আবার ফিরে আসবে? নাকি তারা চিরকালীন অন্ধকারেই ঢাকা থাকবে? কেউ তাদের নাম উচ্চারণ করবে না, কেউ জানবে না যে তারা ছিল।
এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি না। তবে কোথাও, আমাদের কল্পনার গহীন ছায়ায়, এই প্রশ্নগুলো নিঃশব্দে ধ্বনিত হয়। যেন সেই চাপাপড়া গল্পেরা আমাদেরই সন্ধান করছে। প্রতীক্ষায় আছে সেই হারিয়ে যাওয়া সত্যগুলোকে কোনো দুঃসাহসী আবার জাগিয়ে তুলবে বলে।



