মিতালীর সঙ্গে আমার আলাপের দিন কলকাতায় বৃষ্টি হয়েছিল।
কলকাতায় বৃষ্টি হওয়া কোনো খবর নয়। বর্ষাকালে কলকাতায় বৃষ্টি হবেই। খবরটা ছিল, সেদিন আমি কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসে বসে জীবনানন্দ পড়ছিলাম।
জীবনানন্দ পড়া অবশ্য তার চেয়েও কম খবর। কলেজ স্ট্রিটে এক কাপ কফি কিনে তিন ঘণ্টা বসে জীবনানন্দ পড়ছে, এমন লোক আপনি ডজনখানেক পাবেন। তাদের মধ্যে অন্তত চারজন মনে মনে কবি, তিনজন প্রকাশককে গাল দিচ্ছে, দুজন প্রেমে ব্যর্থ, একজনের পকেটে বাড়ি ফেরার বাসভাড়া নেই। বাকিদের অবস্থা আরও গুরুতর, তারা নিজেদের সাহিত্যিক মনে করে।
আমি তখন নিজেকে লেখক মনে করতাম।
এই দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে।
লেখক হচ্ছেন যিনি লেখেন। নিজেকে লেখক মনে করা মানুষটি সাধারণত লেখার চেয়ে লেখক হওয়ার দুশ্চিন্তায় বেশি সময় কাটান।
আমি দ্বিতীয় দলে।
আমার সামনে তখন পেঙ্গুইনের ধূসর মলাটের জীবনানন্দ। বইটার মেরুদণ্ড ভাঙা। মাঝখান থেকে দুটো পাতা একটু বেরিয়ে আছে। বহুবার পড়তে পড়তে বইটার অবস্থা এমন হয়েছিল যে সেটাকে বই না বলে বৃদ্ধ আত্মীয় বলা ভালো। বেশি টানাটানি করলে শরীরের কোনো অংশ খুলে হাতে চলে আসতে পারে।
এক হাতে বই, আরেক হাতে কফির কাপ।
কাপটা আমি একটু অদ্ভুতভাবে ধরেছিলাম বোধহয়।
সামনের চেয়ারটা কেউ টেনে বসে পড়ল।
আমি চোখ তুললাম।
একটি মেয়ে।
বয়স আমার কাছাকাছি। হয়তো দু-এক বছর কম। ভেজা চুল পেছনে সরানো। গায়ে সাদা-নীল কুর্তা। চোখে এমন এক ধরনের বিরক্তি, যেন পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষকে সে ইতিমধ্যে পরীক্ষা করে ফেলেছে এবং ফল খুব সুবিধের নয়।
সে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলল,
‘কাপটা ওভাবে পাখির মতো ধরে থাকলে ফেলে দেবেন।’
আমি বললাম, ‘পাখি কাপ ধরে?’
সে বলল, ‘আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে ধরে।’
এই ছিল আমাদের প্রথম কথা।
আজকালকার প্রেমের গল্প হলে এর পরে লেখা হত, I knew instantly that she was different.
আমি কিছুই বুঝিনি।
বরং মনে হয়েছিল মেয়েটা একটু বেয়াদব।
কফি হাউসে আমার টেবিলে এসে বসল, অনুমতি নিল না। ওয়েটার এসে জিজ্ঞেস করল,
‘ম্যাডাম, কী দেব?’
সে বলল, ‘কিছু না।’
ওয়েটার এমনভাবে আমার দিকে তাকাল যেন মেয়েটিকে বসিয়ে এক কাপ কফিও খাওয়াচ্ছি না বলে বঙ্গীয় পুরুষজাতির সম্মান আমি একাই ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছি।
আমি বললাম,
‘কফি খাবেন?’
‘না।’
‘চা?’
‘না।’
‘তা হলে বসেছেন কেন?’
সে আমার বইটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,
‘দেখছিলাম আপনি জীবনানন্দ পড়ছেন, না জীবনানন্দের বই হাতে নিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছেন।’
আমি বললাম,
‘দুটোর মধ্যে তফাত?’
‘প্রথমটা পাঠক করে। দ্বিতীয়টা লেখকরা করে।’
এই মেয়েটির সঙ্গে আমার পরিচয় হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সে আমাকে বেয়াদব, ভানবাজ এবং লেখক, তিনটেই প্রমাণ করে ফেলল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
‘আপনার নাম কী?’
সে বলল,
‘মিতালী।’
‘শুধু মিতালী?’
‘একজন মানুষের সঙ্গে প্রথম আলাপে পুরো বংশপরিচয় দিতে হয়?’
‘না।’
‘তাহলে মিতালীই থাক।’
বাইরে তখন কলেজ স্ট্রিটের আলো বৃষ্টির পানিতে গলে যাচ্ছে। বইয়ের দোকানগুলোর সামনে পলিথিন ঝোলানো। পুরনো বইয়ের গায়ে জল লাগার সেই গন্ধ, মানুষের ভেজা জামা, কফি, সিগারেট, পুরনো কাঠ, কথাবার্তা, চামচের শব্দ, সব মিলে কফি হাউসের সেই বিশেষ বিকেল।
মিতালী জানলার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আজ গঙ্গার রং দেখেছেন?’
‘না।’
‘ঝড়ের আগে হুগলি অদ্ভুত ধূসর হয়। ছাইয়ের সঙ্গে সামান্য নীল মেশালে যেমন হয়।’
আমি বললাম,
‘আপনি রং মাপেন নাকি?’
সে হেসে উঠল।
তার হাসির শব্দটা অদ্ভুত। পরিষ্কার ঘণ্টার মতো নয়। খানিকটা ভাঙা।
অনেক পরে আমি লিখেছিলাম, তার হাসি ছিল ফেটে যাওয়া চীনামাটির কাপের মতো। ভাঙা জায়গা দিয়েও আলো বেরোয়।
সম্পাদক সেই লাইনটার তলায় লিখেছিলেন, Beautiful.
লাইনটা আসলে কার ছিল, তখনও আমি জানতাম না।
২
মিতালী খুব দ্রুত আমার জীবনে ঢুকে পড়েছিল।
কীভাবে ঢুকেছিল তার ঠিক হিসাব আজ আর দিতে পারব না।
স্মৃতির বদভ্যাস এই যে, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো তারিখ মেনে রাখে না। আমার স্কুলের অঙ্ক পরীক্ষায় কত পেয়েছিলাম মনে আছে, অথচ যে মেয়েটির সঙ্গে দিনের পর দিন কাটিয়েছি, প্রথম কবে তার হাত ধরেছিলাম মনে নেই।
আমার ফ্ল্যাটটা ছিল দক্ষিণ কলকাতায়। দুই কামরা। বইয়ে ঠাসা। বই রাখার জায়গা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে মানুষের যে ভুল ধারণা হয়, আরেকটা আলমারি কিনলেই সমস্যার সমাধান হবে, আমিও সেই ভুল করেছিলাম। পরে দেখলাম নতুন আলমারি মানে আরও বই কেনার বৈধতা।
মিতালী এসে প্রথম দিনই বলেছিল,
‘এখানে মানুষ থাকে?’
আমি বললাম,
‘থাকে তো।’
‘কোথায়?’
আমি নিজের দিকে আঙুল দেখালাম।
সে বলল,
‘আপনি নিশ্চিত?’
তারপর থেকে সে প্রায়ই আসত।
অথবা আমি ভাবতাম আসত।
তখন অবশ্য এই ‘ভাবতাম’ শব্দটি আমার মাথায়ও আসেনি।
সন্ধ্যার পরে আমি লিখতে বসতাম। মিতালী কখনও জানলার ধারে বসে পা দোলাত। কখনও বিছানায় উপুড় হয়ে বই পড়ত। কখনও আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাত।
‘এই বাক্যটা বাজে।’
আমি বলতাম,
‘কেন?’
‘লোকটা তার বউকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। অথচ তুমি তিন প্যারাগ্রাফ ধরে আবহাওয়া লিখছ।’
‘আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।’
‘বউটার কাছে?’
‘সাহিত্যে।’
‘সাহিত্যকে গিয়ে বিয়ে করো তাহলে।’
এই বলে সে রান্নাঘরে চলে যেত।
মিতালীর সঙ্গে তর্কে আমার এক সুবিধা ছিল। তর্ক শেষ হওয়ার পরে আমি একা হলে নতুন নতুন যুক্তি খুঁজে পেতাম। ঘুমাতে যাওয়ার আগে মনে হত, আরে, এই কথাটা বললেই তো ও চুপ হয়ে যেত!
জীবনানন্দ নিয়ে আমাদের ঝগড়া ছিল নিয়মিত।
আমি জীবনানন্দকে নিয়ে একটু আবেগপ্রবণ ছিলাম।
মিতালী বলত,
‘তুমি লোকটাকে কবি কম, ব্যক্তিগত দুঃখের লাইসেন্স বেশি বানিয়ে ফেলেছ।’
আমি বলতাম,
‘তুমি জীবনানন্দ বোঝো না।’
সে বলত,
‘এই কথাটা সাধারণত সেই পুরুষেরা বলে যারা নিজেরাও পুরো বোঝে না।’
‘তাহলে তুমি বোঝো?’
‘না। আমার অন্তত এইটুকু সততা আছে।’
এই জায়গায় এসে আমার আর বলার কিছু থাকত না।
মেয়েটা মাঝে মাঝে অসম্ভব নিষ্ঠুর ছিল।
কিন্তু নিষ্ঠুরতার ভেতরেও এমন এক মায়া ছিল যে রাগ ধরে রাখা যেত না।
আমি লিখতে বসলে সে রবীন্দ্রসঙ্গীত গুনগুন করত। অদ্ভুত ব্যাপার, সে সবসময় সুরের থেকে অর্ধেক মাত্রা পিছিয়ে থাকত।
আমি বলতাম,
‘তুমি গানটা নষ্ট করছ।’
সে বলত,
‘রবীন্দ্রনাথ সামলে নেবেন।’
‘সব গানে তুমি লেট কেন?’
‘আমি সময়মতো কোথাও পৌঁছাই না।’
‘আমার জীবনে তো পৌঁছে গেছ।’
সে তখন একটু থামত।
তারপর খুব আস্তে বলত,
‘দেখা যাবে।’
৩
মিতালীর একটা বদভ্যাস ছিল আমার বইয়ে লেখা।
আমি বইয়ে দাগ দিই। নোট লিখি। পাশে প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসাই। কোনো লেখকের বক্তব্যে রাগ হলে ‘nonsense’ লিখে রাখি। একবার নিজের পুরনো বই খুলে নিজের লেখা ‘nonsense’ দেখে পনেরো মিনিট ভেবেছিলাম লেখককে গালি দিয়েছিলাম, না নিজের আগের মন্তব্যকে, বুঝতে পারিনি।
মিতালীও লিখত।
জীবনানন্দের একটা কবিতার পাশে লিখেছিল,
‘তুমি এই জায়গাটা ভুল বুঝেছ।’
আমি লিখলাম,
‘কেন?’
পরের দিন নিচে তার উত্তর,
‘কারণ তুমি সবকিছুর মধ্যে নিজেকে খোঁজো।’
তার নিচে আমি,
‘পাঠক আর কী খুঁজবে?’
তার নিচে সে,
‘কখনও কবিকেও খুঁজে দেখতে পারো।’
এইভাবে বইয়ের মার্জিনে আমাদের সংসার চলত।
একদিন আমি বললাম,
‘তোমার হাতের লেখা আমার মতো কেন?’
সে বলল,
‘তোমার ধারণা পৃথিবীর সব ভালো জিনিস তুমি আগে আবিষ্কার করেছ?’
আমি দুটো লেখা পাশাপাশি রেখে দেখলাম।
অদ্ভুত মিল।
‘তুমি নকল করছ।’
‘হ্যাঁ। অনেকদিন ধরে গোপনে তোমার হাতের লেখা প্র্যাকটিস করছি। এরপর তোমার ব্যাংকের চেক লিখব।’
আমি বললাম,
‘আমার ব্যাংক ব্যালান্স দেখলে এই কষ্ট করতে না।’
মিতালী অনেকক্ষণ হাসল।
ওর হাসির একটা ভালো দিক ছিল। আমার আর্থিক অবস্থার মতো বিষয় নিয়েও আন্তরিক আনন্দ পেত।
৪
সেই বছর আমার লেখা বদলে গেল।
এর আগে বছরে একটা গল্প শেষ করতে পারলে নিজেকে টলস্টয় মনে হত। তারপর এক বছরে তিনটে গল্প লিখে ফেললাম।
তিনটেই ছাপা হল।
একটা গল্প নিয়ে সম্পাদক আমাকে ফোন করলেন।
বয়স্ক মানুষ। বাংলা সাহিত্যের বেশ নামকরা পত্রিকা। তিনি বললেন,
‘আপনার লেখায় এবার একটা নতুন স্বর এসেছে।’
আমি বললাম,
‘কী রকম?’
‘ঠিক ধরতে পারছি না। একটা দ্বিতীয় কণ্ঠ আছে। খুব নারীত্বপূর্ণ। কিন্তু নকল মনে হচ্ছে না। যেন আপনার নিজের গদ্যের মধ্যে আরেকজন কথা বলছে।’
আমার পেছনে তখন মিতালী বসে ছিল।
আমি ঘুরে তাকালাম।
সে জিভ বের করে আমাকে ভ্যাঙাল।
সম্পাদক বললেন,
‘হ্যালো?’
‘জি, শুনছি।’
‘এই স্বরটা ধরে রাখবেন।’
আমি বললাম,
‘চেষ্টা করব।’
ফোন রেখে মিতালীর দিকে তাকালাম।
সে বলল,
‘শুনলে?’
‘কী?’
‘আমার প্রশংসা করছে।’
‘লিখেছি আমি।’
‘আচ্ছা?’
‘তুমি কী করেছ?’
‘বাজে জায়গাগুলো কেটে দিয়েছি।’
‘এইজন্যই তো লেখকরা বিয়ে করে না।’
‘তুমি লেখক?’
আমি চুপ করলাম।
ওর সঙ্গে কথা বলার সবচেয়ে বড় অসুবিধা ছিল, যে অস্ত্র দিয়ে আপনি আক্রমণ করবেন, সেটাই ঘুরিয়ে আপনার হাতে দিয়ে দিত।
বন্ধুরাও পরিবর্তনটা লক্ষ করল।
সৌরভ একদিন বলল,
‘তোর কী হয়েছে?’
‘কেন?’
‘আগে সবসময় দেখে মনে হত পৃথিবীর শেষ বিদ্যুৎবিলটা তোকেই দিতে হবে। এখন বেশ হালকা লাগছে।’
আমি বললাম,
‘প্রেম করছি।’
সৌরভ প্রায় কফি ফেলে দিল।
‘কে?’
‘মিতালী।’
‘কোথাকার?’
আমি একটু থেমে বললাম,
‘কলকাতারই।’
‘কী করে?’
আমি ঠিক জানতাম না।
আশ্চর্য, এতদিনের সম্পর্ক, কিন্তু মিতালী কী কাজ করে সেটা আমি স্পষ্ট করে বলতে পারতাম না।
সে বলেছিল ফ্রিল্যান্স কিছু করে।
কী ফ্রিল্যান্স?
‘এইসব।’
এইসবের সংজ্ঞা জানতে চাইলে বলত,
‘তোমার গল্পের লোকদের পেশা থাকে?’
‘থাকে।’
‘তাহলে আমারও একটা দিয়ে দাও।’
সৌরভ বলল,
‘একদিন নিয়ে আয়।’
‘ও একটু লাজুক।’
‘ছবি?’
আমার ফোন খুলে দেখি মিতালীর কোনো ছবি নেই।
অদ্ভুত।
আমি বললাম,
‘ছবি তুলতে পছন্দ করে না।’
সৌরভ বলল,
‘একুশ শতকে এরকম মানুষও আছে?’
আমি বললাম,
‘থাকতে পারে।’
‘নাকি তুই আবার সাহিত্য করতে গিয়ে বানিয়ে ফেলেছিস?’
আমি হেসেছিলাম।
খুব জোরে।
এত জোরে যে সৌরভও হেসে ফেলেছিল।
আজ ভাবি, আমার হাসিটা কি একটু বেশি জোরে ছিল?
৫
আমাদের প্রথম পরিচয়ের এক বছর পূর্ণ হল আগস্ট মাসে।
আমি মিতালীকে বললাম,
‘চলো, বাইরে খেতে যাই।’
সে বলল,
‘কোথায়?’
‘ফ্লুরিজ।’
‘কেন?’
‘এক বছর।’
‘এক বছর কী?’
আমি আহত হলাম।
‘আমাদের।’
সে খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
‘ও।’
মেয়েদের এই ‘ও’ শব্দের রহস্য আমি কোনোদিন বুঝিনি। পুরুষ মানুষ একটা বক্তৃতা, তিনখানা ফুল, একটি দামি ডিনার, দশ কিলোমিটার ড্রাইভের আয়োজন করে যে কথা বোঝাতে চায়, একজন নারী অনেক সময় শুধু ‘ও’ বলে সেই আবেগের গলা টিপে দিতে পারে।
আমি টেবিল বুক করলাম।
দুজনের।
মিতালী আসেনি।
সন্ধ্যা সাতটা।
সাড়ে সাতটা।
আটটা।
ফোন করলাম।
রিং গেল।
ধরল না।
ওয়েটার তিনবার এসে জিজ্ঞেস করল,
‘স্যার, ম্যাডাম আসছেন?’
আমি বললাম,
‘আসছে।’
সাড়ে আটটার সময় খাবার অর্ডার দিলাম।
দুটো ডেজার্টও।
একটা মিতালীর পছন্দের।
কী ছিল আজ মনে নেই। হয়তো চকলেট কিছু।
ওয়েটার যখন দ্বিতীয় ডেজার্টটা রাখল, আমি বললাম,
‘ও একটু ফোন করতে বাইরে গেছে।’
লোকটা আমার দিকে তাকাল।
ওই তাকানোটা আমার পছন্দ হয়নি।
আমি দুটো ডেজার্টই খেয়ে ফেললাম।
আমার চরিত্রের দৃঢ়তা নিয়ে কারও সন্দেহ থাকলে বলে রাখি, প্রেমে ব্যর্থ হলেও মিষ্টি নষ্ট করার মতো নিষ্ঠুর আমি কোনোদিন ছিলাম না।
রাতে বাড়ি ফিরে দেখি মিতালী জানলার ধারে বসে।
আমি রেগে বললাম,
‘তুমি গেলে না কেন?’
সে জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল,
‘পারিনি।’
‘ফোন?’
‘ধরিনি।’
‘কেন?’
সে উত্তর দিল না।
আমি পকেট থেকে ছোট বাক্সটা বের করলাম।
রুপোর নাকছাবি।
খুব ছোট।
মাঝখানে নীল পাথর।
মিতালী বাক্সটা খুলে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
‘আমি তো নাকছাবি পরি না।’
আমি বললাম,
‘পরবে।’
‘যদি না পরি?’
‘তাহলে রেখে দিও।’
সে বাক্সটা হাতে নিয়ে বলল,
‘রাখব।’
কোনোদিন তাকে সেটা পরতে দেখিনি।
৬
আমার বোন অদিতি দিল্লি থেকে এল পরের বর্ষায়।
অদিতির স্বভাব আমার উল্টো। সে ঘরে ঢুকেই জানে কোন জিনিস কোথায় থাকা উচিত। কোন তোয়ালেটা পরিষ্কার। ফ্রিজের দুধ কবে শেষ হবে। জীবনবীমার প্রিমিয়াম কোন তারিখে। আমি যে জাতীয় মানুষ দুদিন ফ্রিজ খুলে খুঁজেও সামনে রাখা জিনিস দেখতে পাই না, তার সঙ্গে অদিতির রক্তের সম্পর্ক কীভাবে হল, বিজ্ঞান একদিন নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করবে।
সে তিন রাত ছিল।
প্রথম দিন বলল,
‘মিতালী কোথায়?’
‘কাজে।’
‘রাতে?’
‘ওর সময় একটু অদ্ভুত।’
দ্বিতীয় দিন বলল,
‘আজ?’
‘বন্ধুর বাড়ি।’
‘আমার সঙ্গে দেখা করবে না?’
‘করবে।’
তৃতীয় দিন সকালে আমি উঠে দেখি অদিতি বাথরুমে দাঁড়িয়ে।
হাতে দুটো টুথব্রাশ।
একটা আমার।
আরেকটা মিতালীর।
অদিতি বলল,
‘এটা কার?’
‘মিতালীর।’
‘হুঁ।’
শুধু ‘হুঁ’।
সারাদিন আর কিছু বলল না।
রাতে রান্নাঘরের টেবিলে আমাকে বসাল।
তার মুখে সেই দিদিসুলভ গাম্ভীর্য, যেটা দেখে ছোটবেলায় বুঝতাম আমি কোনো অপরাধ করেছি, যদিও অপরাধটা এখনও আমাকে জানানো হয়নি।
সে বলল,
‘রাগ করিস না।’
‘কেন?’
‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব।’
‘কর।’
‘মিতালী সত্যিই এখানে থাকে?’
আমি প্রথমে বুঝতেই পারিনি।
‘মানে?’
‘মানে থাকে?’
‘আসে তো।’
‘কতদিন?’
‘প্রায়ই।’
‘ঘুমোয়?’
‘হ্যাঁ।’
‘কোথায়?’
আমি বেডরুম দেখালাম।
অদিতি উঠে গেল।
আমিও পেছনে।
সে দ্বিতীয় বালিশটার দিকে তাকাল।
আমার বালিশের মাঝখানে মাথার গর্ত।
অন্যটা একেবারে সমান।
সে আলমারি খুলল।
একদিকে আমার জামাকাপড়।
অন্যদিকে কয়েকটা মেয়েদের পোশাক।
অদিতি একটা শার্ট নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নিল।
তারপর আরেকটা।
‘কী করছিস?’
সে বলল,
‘কিছু না।’
রান্নাঘরে ফিরে এসে অনেকক্ষণ চুপ থাকল।
তারপর খুব নরম গলায় বলল,
‘মিতালীর সঙ্গে কাল দেখা করিয়ে দিবি?’
আমি বললাম,
‘অবশ্যই।’
পরদিন বললাম,
‘ওর শরীর খারাপ।’
তার পরদিন,
‘একটা কাজ পড়েছে।’
তার পরদিন,
‘ও শহরের বাইরে গেছে।’
কাল থেকে পরশু, পরশু থেকে আগামী সপ্তাহ।
অদিতি আর জোর করল না।
দিল্লি ফিরে যাওয়ার সকালে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময়।
তারপর চলে গেল।
ফ্রিজ খুলতে গিয়ে কাগজটা পেলাম।
ম্যাগনেট দিয়ে আটকানো।
একজন ডাক্তারের নাম।
ফোন নম্বর।
নিচে অদিতির হাতের লেখা।
আমি তোকে ভালোবাসি। প্লিজ।
বহু বছর পরে আজও ওই ‘প্লিজ’ শব্দটা পড়তে আমার অসুবিধা হয়।
কারণ ভালোবাসার সবচেয়ে অসহায় রূপ বোধহয় সেই একটিমাত্র শব্দ।
যখন একজন মানুষ আর জানে না কীভাবে আরেকজন মানুষকে বাঁচাবে, তখন সে বলে,
প্লিজ।
৭
আমি ডাক্তারকে ফোন করিনি।
তার বদলে নোটবুক খুললাম।
লেখকজাতির একটা রোগ আছে। জীবন যখন ভেঙে পড়ে, তখনও আমরা প্রথমে ভাবি এই অভিজ্ঞতাটা দিয়ে একটা ভালো লেখা হতে পারে।
আমি মিতালীকে চিঠি লিখব ঠিক করেছিলাম।
অদিতির কথা বলব।
টুথব্রাশের গল্পটা নিয়ে হাসব।
বলব,
‘দেখো, আমার বোন মনে করছে তুমি নেই। কালই এসে ওকে একটা ধমক দিয়ে যাও।’
নোটবুকটা ছিল কালো মলাটের।
পুরনো।
আমি পাতা উল্টালাম।
এক জায়গায় একটা লাইন চোখে পড়ল।
কাপটা ওভাবে পাখির মতো ধরে থাকলে ফেলে দেবে।
আমার হাত থেমে গেল।
লাইনটা আমার হাতের লেখা।
তারিখ দেওয়া।
মিতালীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পাঁচ মাস আগে।
আমি আরও পাতা উল্টালাম।
ঝড়ের আগে হুগলির জল ছাইয়ের সঙ্গে নীল মেশানো রঙের হয়।
তারিখ সাত মাস আগের।
আরেক পাতা।
তুমি সব কবিতার মধ্যে নিজেকে খুঁজে বেড়াও। কখনও কবিকেও খুঁজে দেখতে পারো।
আরেকটা।
সাহিত্যকে গিয়ে বিয়ে করো তাহলে।
আরেকটা।
আমি সময়মতো কোথাও পৌঁছাই না।
আরেকটা।
দেখা যাবে।
আমি বসে রইলাম।
কতক্ষণ জানি না।
শব্দগুলো প্রথমে শব্দই ছিল।
তারপর ধীরে ধীরে সেগুলো আমার দিকে তাকাতে শুরু করল।
আমি শেলফ থেকে জীবনানন্দের বইটা নামালাম।
মার্জিনে মিতালীর লেখা।
আমার লেখা।
এতদিন পাশাপাশি দেখে কেন বুঝিনি?
আমি অন্য বই খুললাম।
একই হাত।
আরেকটা।
একই হাত।
‘তুমি নকল করছ’ বলে আমি যাকে ঠাট্টা করেছিলাম, সেই হাতের লেখা প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি ‘ক’, প্রতিটি দীর্ঘ ঈ-কার পর্যন্ত আমার।
আমি উঠে বাথরুমে গেলাম।
দ্বিতীয় টুথব্রাশ।
শুকনো।
আলমারি খুললাম।
মেয়েদের জামা।
কোনো গন্ধ নেই।
একটি মানুষের পোশাক দীর্ঘদিন আলমারিতে থাকলে তাতেও কিছু থাকে। সাবান। ঘাম। পারফিউম। শরীর। ধুলো।
এগুলোতে কিছুই নেই।
আমি তখনও মরিয়া হয়ে প্রমাণ খুঁজছি।
রুপোর নাকছাবি।
ড্রয়ার খুললাম।
বাক্সটা সেখানে।
যেদিন কিনেছিলাম সেদিন দোকানদার যে তুলোর ওপর সেটি রেখে দিয়েছিল, ঠিক সেইভাবে।
মিতালী কখনও ছোঁয়নি।
আমি নোটবুকের কাছে ফিরে গেলাম।
পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটি পুরনো অসমাপ্ত উপন্যাসের খসড়া পেলাম।
মায়ের মৃত্যুর পরের শীতে লিখেছিলাম।
দশ-বারো পৃষ্ঠা লিখে ছেড়ে দিয়েছিলাম।
সেখানে একটি নদীর বর্ণনা।
বিকেলের শেষে হুগলি তখন এমন ধূসর, যেন ছাইয়ের সঙ্গে কেউ অল্প নীল মিশিয়েছে।
আমার বুকের ভেতর কিছু একটা ধসে পড়ল।
মা।
এক বছর।
আমি মায়ের মৃত্যুর পরের এক বছরটার কথা কোনোদিন কারও সঙ্গে ঠিকমতো বলিনি।
লোকজন এসেছিল।
শোক জানিয়েছিল।
ফোন করেছিল।
বলেছিল, ‘শক্ত হও।’
এই ‘শক্ত হও’ কথাটি শোকগ্রস্ত মানুষকে কেন বলা হয় আমি জানি না। মানুষ কি ইট? সিমেন্ট দিয়ে শক্ত করতে হবে?
আমি শক্তই হয়েছিলাম।
খুব শক্ত।
এমন শক্ত যে কাঁদতেও পারিনি।
মায়ের ঘর গুছিয়েছি।
কাপড় বিলিয়েছি।
ওষুধ ফেলে দিয়েছি।
ব্যাংকের কাজ করেছি।
মৃত্যুসনদ তুলেছি।
যে ছেলে জীবনে বিদ্যুতের বিল সময়মতো দেয়নি, সেই ছেলে মায়ের মৃত্যুর পরে কী আশ্চর্য দক্ষতায় সমস্ত কাগজপত্র সামলেছিল!
সবাই বলেছিল,
‘খুব সাহসী।’
কেউ বুঝল না, আমি কেবল কাজ করে যাচ্ছিলাম।
কারণ কাজ থামলে অন্য কিছু শুরু হবে।
আমি সেটা শুরু হতে দিতে চাইনি।
মিতালী এসেছিল সেই কয়েক মাস পরে।
এক বর্ষার সন্ধ্যায়।
অথবা আমি তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম সেখানে।
৮
আমি সেই রাতেই কফি হাউসে যাইনি।
দুই দিন পরে গেলাম।
বৃষ্টি হচ্ছিল।
অদ্ভুতভাবে ঠিক প্রথম দিনের মতো।
কলেজ স্ট্রিট দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল আমি বহুদিন আগের নিজের পেছনে হাঁটছি।
পুরনো বইয়ের দোকান।
বৃষ্টির জল।
ট্রামের তার।
লোকের ভিড়।
চায়ের কেটলি।
সিগারেটের ধোঁয়া।
কেউ পরীক্ষার বই কিনছে।
কেউ মার্ক্স।
কেউ শরৎচন্দ্র।
কেউ প্রেমপত্র লুকিয়ে রাখার মতো করে কবিতার বই কিনছে।
পৃথিবী নিজের মতো চলছে।
এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম এবং সবচেয়ে আশ্বস্ত করার ব্যাপার।
আপনার জীবন ভেঙে পড়লেও কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের দরদাম বন্ধ হয় না।
আমি কফি হাউসে উঠলাম।
আমাদের টেবিল।
মিতালী বসে ছিল।
সাদা-নীল কুর্তা।
চুল ভেজা।
যেমন প্রথম দিন।
আমি গিয়ে সামনে দাঁড়ালাম।
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আজ কাপ নেই?’
আমি বসিনি।
বললাম,
‘তুমি কে?’
মিতালী একটু হাসল।
‘এতদিন পরে প্রশ্নটা করলে?’
‘তুমি কে?’
সে জানলার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টি পড়ছে।
‘তুমি জানো।’
‘আমি কিছু জানি না।’
‘জানো।’
আমি বললাম,
‘তুমি সত্যি?’
সে আমার দিকে তাকাল।
অনেকক্ষণ।
তার চোখে দয়া ছিল।
এই দয়া আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।
‘মিতালী, তুমি সত্যি?’
সে বলল,
‘তোমার কাছে ছিলাম।’
‘এই উত্তর না।’
‘আর কী উত্তর দেব?’
‘তুমি মানুষ?’
মিতালী একটু মাথা নিচু করল।
তারপর বলল,
‘তুমি আমাকে লিখেছিলে।’
আমি চেয়ারটা ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।
‘কেন?’
‘কারণ তোমার কাউকে দরকার ছিল।’
‘আমি পাগল?’
সে সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
‘আমি ওই কথা বলিনি।’
‘তাহলে?’
‘তুমি একা ছিলে।’
‘আমার বন্ধু ছিল।’
‘ছিল।’
‘বোন ছিল।’
‘ছিল।’
‘আমি কাজ করতাম।’
‘করতে।’
‘তাহলে একা কোথায়?’
সে বলল,
‘মানুষের চারপাশে লোক থাকলেই তার একাকীতব দূর হয় না।’
আমি কিছু বললাম না।
কফি হাউসের শব্দ যেন অনেক দূরে চলে গেছে।
মিতালী বলল,
‘তোমার মা মারা যাওয়ার পর তুমি কারও সামনে ভাঙতে চাওনি। একা ঘরে ফিরতে। লিখতে বসতে। লিখতে পারতে না। নিজের সঙ্গে কথা বলতে। উত্তরও নিজেই দিতে। একদিন সেই উত্তরের একটা নাম দিলে।’
‘মিতালী?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন এই নাম?’
সে কাঁধ ঝাঁকাল।
‘আমাকে জিজ্ঞেস করছ?’
আমি প্রায় চিৎকার করে বললাম,
‘হ্যাঁ, তোমাকেই তো জিজ্ঞেস করছি!’
পাশের টেবিল থেকে কেউ তাকাল।
মিতালী তাকাল না।
খুব শান্তভাবে বলল,
‘তুমি একটি গল্প শুরু করেছিলে। সেখানে মেয়েটার নাম মিতালী ছিল।’
হঠাৎ মনে পড়ল।
একটা গল্প।
দশ বছর আগে।
তিন পৃষ্ঠা।
শেষ করিনি।
‘তুমি আমার সঙ্গে কফি হাউসে দেখা করেছিলে।’
‘তুমি আমাকে এখানে বসিয়েছিলে।’
‘তুমি আমার বাড়িতে থাকতে।’
‘তুমি আমার জন্য জায়গা রেখেছিলে।’
‘তুমি আমার বইয়ে লিখেছ।’
‘তুমি লিখেছ।’
‘তুমি আমার সঙ্গে ঝগড়া করেছ।’
‘তুমি নিজের সঙ্গে ঝগড়া করেছ।’
আমি বললাম,
‘আর আমি তোমাকে ভালোবেসেছি।’
মিতালী এবার আর সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
তার মুখে যে হাসিটা এল, সেটা আমি কোনোদিন ভুলিনি।
দুঃখীও না।
খুশিও না।
যেন কেউ ট্রেনের জানলা দিয়ে বিদায় দিচ্ছে।
সে বলল,
‘সেটাও তুমি করেছ।’
আমি বসে পড়লাম।
আমার দুই হাত কাঁপছিল।
মিতালী বলল,
‘আমার জন্য খারাপ লাগবে?’
আমি রেগে বললাম,
‘তোমার জন্য খারাপ লাগবে কি না সেটাও কি আমাকে লিখে দিতে হবে?’
সে হেসে উঠল।
সেই ফাটা চীনামাটির হাসি।
‘এই তো। আবার রেগে যাচ্ছ।’
আমি বললাম,
‘তুমি গেলে আমি কী করব?’
‘যা করতে।’
‘কী?’
‘লিখবে।’
‘আমি লিখতে পারছিলাম না বলেই তো তুমি এসেছিলে।’
‘এখন পারো।’
‘ওই গল্পগুলো?’
‘তোমার।’
‘সম্পাদক যে দ্বিতীয় কণ্ঠের কথা বলেছিল?’
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘সেটাও তোমার।’
আমি মাথা নাড়লাম।
‘না।’
‘হ্যাঁ।’
‘ওটা তুমি।’
‘আমাকে কোথা থেকে বানিয়েছিলে?’
আমি চুপ।
‘তোমার পড়া বই থেকে। তোমার মায়ের কথা থেকে। তুমি যেসব নারীকে ভালোবেসেছ, যাদের বুঝতে পারোনি, যাদের কাছে ক্ষমা চাইতে পারোনি, যাদের কথা শুনেছ, যাদের কথা শোনোনি, সবখান থেকে। তোমার মধ্যে যতগুলো কণ্ঠ এতদিন চাপা ছিল, সেগুলোর একটু একটু করে আমাকে বানিয়েছ।’
‘তাহলে তুমি আমি?’
‘তার চেয়ে আমি মিতালী থাকি। শুনতে ভালো লাগে।’
আমি হাসলাম।
চোখ দিয়ে জল পড়ছিল।
খেয়ালই করিনি।
সে বলল,
‘এই প্রথম দেখলাম।’
‘কী?’
‘তুমি কাঁদছ।’
আমি হাত দিয়ে চোখ মুছলাম।
‘চুপ করো।’
‘তোমার মা মারা যাওয়ার পর কেঁদেছিলে?’
আমি উত্তর দিলাম না।
মিতালী আস্তে বলল,
‘কাঁদো।’
আমি বললাম,
‘এই কফি হাউসের মধ্যে?’
‘কলকাতায় এর চেয়ে অনেক খারাপ কাজ প্রকাশ্যে হয়।’
আমি এবার সত্যিই হেসে ফেললাম।
হাসতে হাসতে কেঁদে ফেললাম।
আমার সামনে মিতালী বসে।
আমার মা নেই।
এক বছর কেটে গেছে।
আমার এতদিনের প্রেমিকা হয়তো কোনোদিন ছিল না।
আর সেই মুহূর্তে অদ্ভুতভাবে মনে হল, দুজনেই আছে।
একজন স্মৃতির ভেতরে।
আরেকজন লেখার ভেতরে।
মানুষের জীবন অনেক সময় এই দুটো ঘরেই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
৯
অনেকক্ষণ পরে মিতালী বলল,
‘নাকছাবিটা সুন্দর ছিল।’
আমি তাকালাম।
‘তুমি তো পরোনি।’
‘পরতে পারিনি।’
‘জানি।’
‘রাগ করেছ?’
‘খুব।’
সে বলল,
‘রেখে দিও।’
‘কেন?’
‘কোনো গল্পে কাজে লাগবে।’
‘তুমি শেষ পর্যন্ত সাহিত্যিকই হলে।’
‘তোমার সঙ্গে এতদিন থেকে আর কী হব?’
আমরা দুজনেই হাসলাম।
তারপর সে বলল,
‘এবার আমাকে যেতে হবে।’
আমি বললাম,
‘কোথায়?’
‘এই প্রশ্নটা করো না।’
‘আবার আসবে?’
সে উত্তর দিল না।
‘মিতালী।’
‘হুঁ?’
‘আরেকটু থাকো।’
সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে আবার সেই দয়া।
এবার দয়া আমাকে আহত করল না।
সে বলল,
‘আমি যতদিন দরকার ছিল, তার চেয়েও একটু বেশি থেকেছি।’
‘কেন?’
‘তুমি ছাড়ছিলে না।’
‘এখন?’
‘এখন তোমার বোন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধুরা আছে। বই আছে। তোমার নিজের কণ্ঠটা আবার শুনতে পাচ্ছ।’
‘আর তুমি?’
‘আমার কাজ শেষ।’
আমি বললাম,
‘তুমি খুব বাজে।’
সে হাসল।
‘জানি।’
‘নিষ্ঠুর।’
‘এটাও বলেছ।’
‘বেয়াদব।’
‘প্রথম দিন থেকেই।’
‘আর জীবনানন্দ তুমি এখনও বোঝো না।’
সে এবার এমনভাবে হেসে উঠল যে পাশের দুটো টেবিলের লোক ঘুরে তাকাল কি না, মনে নেই।
আমি চোখ নামালাম।
এক মুহূর্তের জন্য।
শুধু এক মুহূর্ত।
আবার তাকিয়ে দেখি চেয়ারটা খালি।
আমি বসে রইলাম।
কতক্ষণ কে জানে।
ওয়েটার এসে বলল,
‘স্যার, আর কিছু দেব?’
আমি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে বললাম,
‘এখানে যে ম্যাডাম বসেছিলেন…’
লোকটা ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘কোন ম্যাডাম?’
‘এই যে।’
‘এখানে?’
‘হ্যাঁ।’
ওয়েটার বলল,
‘স্যার, আপনি তো একাই বসে আছেন।’
আমি বললাম,
‘কতক্ষণ?’
সে ঘড়ি দেখে বলল,
‘প্রায় চার ঘণ্টা হয়ে গেল।’
আমি জানলার বাইরে তাকালাম।
কলেজ স্ট্রিটে তখনও বৃষ্টি।
ওয়েটার একটু ইতস্তত করে বলল,
‘আরেকটা কফি দেব?’
আমি তার দিকে তাকালাম।
‘দিন।’
লোকটা চলে যাচ্ছিল।
আমি ডেকে বললাম,
‘একটাই।’
সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল।
আমি বললাম,
‘আজ একটাই।’
১০
বাড়ি ফিরলাম হাঁটতে হাঁটতে।
বৃষ্টি খুব জোরে ছিল না।
ছাতা ছিল।
খুলিনি।
কেন খুলিনি সেটা নিয়ে সাহিত্য করার দরকার নেই। অনেক সময় মানুষের হাতে ছাতা থাকে, তবু সে ভিজে। এইটুকুই যথেষ্ট।
বাড়িতে ঢুকে প্রথমে বাথরুমে গেলাম।
দুটো টুথব্রাশ।
মিতালীরটা হাতে নিলাম।
অনেকক্ষণ দেখলাম।
তারপর ফেলে দিলাম।
আলমারি খুলে তার জামাকাপড় একটা ব্যাগে ভরলাম।
রুপোর নাকছাবিটা ফেলিনি।
আজও আমার কাছে আছে।
অদিতিকে ফোন করলাম।
দিল্লিতে তখন রাত।
সে ফোন ধরেই বলল,
‘হ্যালো?’
আমি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলাম না।
অদিতি বলল,
‘কী হয়েছে?’
আমি বললাম,
‘ডাক্তারের নম্বরটা এখনও আছে?’
ওপাশে অনেকক্ষণ চুপ।
তারপর খুব আস্তে বলল,
‘আছে।’
আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
এই জন্য বোনেরা অনেক সময় বন্ধুদের চেয়ে বেশি ভয়ংকর এবং বেশি দরকারি। তারা উত্তর জানার আগেই আপনার প্রশ্নটা বুঝে ফেলে।
ফোন রেখে ডেস্কে গেলাম।
কালো নোটবুক।
খোলা।
সাদা পাতা।
আমি বসে কলম তুললাম।
এক বছর ধরে আমি লিখেছি মিতালীর সঙ্গে।
সে আমার বাক্য কেটেছে।
আমাকে অপমান করেছে।
আমার কবিতাবোধ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
আমার কফি খাওয়ার ভঙ্গি নিয়ে বিদ্রুপ করেছে।
আমার গদ্যের ভেতরে ঢুকে আরেকটা স্বর তৈরি করেছে।
আমি প্রথমবার একা বসেছি।
খুব ভয় লাগছিল।
লেখকরা সাদা পাতাকে যতটা ভয় পায়, বাঘকে তার অর্ধেক ভয় পেলেও সুন্দরবনে মানুষের মৃত্যু কমত।
আমি অনেকক্ষণ কিছু লিখতে পারলাম না।
তারপর লিখলাম,
‘আজ মিতালী চলে গেল।’
কেটে দিলাম।
আবার লিখলাম।
‘আজ বৃষ্টি হয়েছিল।’
এটাও কেটে দিলাম।
জানলার বাইরে তাকালাম।
বৃষ্টির জল কাচ বেয়ে নামছে।
দূরে একটা গাড়ি হর্ন দিল।
উপরের ফ্ল্যাটে কেউ চেয়ার টানল।
ফ্রিজের ভেতর কম্প্রেসর চালু হল।
একটা সাধারণ রাত।
মিতালী থাকলে বলত,
‘আবহাওয়া দিয়ে শুরু করছ আবার?’
আমি প্রায় উত্তর দিতে গিয়েছিলাম।
থামলাম।
ঘর চুপ।
কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত নেই।
কেউ অর্ধেক মাত্রা পিছিয়ে গাইছে না।
কেউ বলছে না বাক্যটা বাজে।
কেউ আমার বইয়ের মার্জিনে লিখছে না।
সেই নীরবতাটা প্রথমে অসহ্য লাগল।
তারপর ধীরে ধীরে তার ভেতরে আরেকটা শব্দ শুনলাম।
কলমের নিব কাগজের ওপর ঘষার শব্দ।
আমি লিখছি।
এক লাইন।
তারপর আরেক লাইন।
তারপর আরেকটা।
রাত বাড়ল।
আমি লিখতে থাকলাম।
ভোরের দিকে একবার নোটবুকের আগের পাতাগুলো উল্টে দেখলাম।
মিতালীর সমস্ত কথা আমার হাতের লেখায়।
একসময় খুব ভয় লাগত এই দৃশ্য দেখে।
সেদিন আর লাগল না।
আমি পাতাগুলোর ওপর হাত রাখলাম।
মনে মনে বললাম,
‘ধন্যবাদ।’
কোথাও থেকে কোনো উত্তর এল না।
সত্যি বলতে কী, একটু খারাপই লাগল।
মেয়েটা এতদিন ধরে প্রত্যেক কথার উত্তর দিয়েছে। বিদায়ের পরে অন্তত একটা ‘হুঁ’ বলতে পারত।
কিন্তু গল্পের চরিত্রদেরও বোধহয় আত্মসম্মান থাকে।
লেখক একবার বিদায় দিলে তারা সবসময় ফিরে তাকায় না।
আমি নতুন পাতায় গেলাম।
কলম ধরলাম।
তারপর এক বছরের মধ্যে প্রথমবার এমন একটি বাক্য লিখলাম, যার পাশে কেউ এসে কিছু যোগ করল না।
কেউ কাটল না।
কেউ সংশোধন করল না।
কেউ বলল না, এই জায়গাটা আমি ভুল বুঝেছি।
বাক্যটা একা দাঁড়িয়ে রইল।
আমার মতো।
কিন্তু এবার একা থাকা আর ফাঁকা থাকা একই ব্যাপার মনে হল না।
আমি পরের বাক্যটি লিখলাম।
তারপর তৃতীয়টি।
বাইরে তখন কলকাতার সকাল শুরু হচ্ছে।
আর বহুদিন পরে, আমার লেখার ভেতরে কেবল একজনেরই কণ্ঠ শোনা যাচ্ছিল।
আমার।
তবু কোথাও, খুব গভীরে, অর্ধেক মাত্রা পিছিয়ে কেউ যেন রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছিল।



