জাতিগণনার বিরোধিতা
ভারতীয় সমাজে জাতপাতের বাস্তবতা আজও বিলুপ্ত হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৫১ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জনগণনার সময় কেন্দ্রীয় সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় যে, সাধারণ জনগণের জাতিগত পরিচয় আর পৃথকভাবে নথিভুক্ত করা হবে না। এই সিদ্ধান্তের ব্যতিক্রম ছিল তফসিলি জাতি ও তফসিলি জনগোষ্ঠী; পরবর্তী প্রতিটি জনগণনায় তাদের তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত থাকে। অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল নির্ভর করা হয়েছে ১৯৩১ সালের ব্রিটিশ শাসনামলের জনগণনার ওপর। সেই পুরোনো পরিসংখ্যানকে ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ নির্ধারিত হয়। ১৯৯০ সালে ভি. পি. সিং সরকার মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই দেশে পূর্ণাঙ্গ জাতিভিত্তিক জনগণনার দাবি নতুন রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী কেন্দ্রীয় সরকার এই দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু ২০২৫ সালের জুনে কেন্দ্র তার অবস্থান পরিবর্তন করে এবং অক্টোবর থেকে জাতিভিত্তিক জনগণনার কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত জানায়।
এই সিদ্ধান্ত ঘোষিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই দেশজুড়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। ড. আনন্দ তেলতুম্বড়ের দ্য কাস্ট কন সেন্সাস গ্রন্থটি সেই বিতর্কেরই একটি অংশ। বইয়ের নাম থেকেই বোঝা যায়, লেখক জাতিভিত্তিক জনগণনার বিরোধী; তাঁর ধারণা, এই গণনা জাতপাতের সমস্যার প্রতিকার না করে বরং সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। কোনও নীতির বিরোধিতা অবশ্যই অগ্রহণযোগ্য নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে বিরোধের অধিকার চিন্তার স্বাধীনতার মৌল শর্ত। অথচ সেই বিরোধকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে তার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং যুক্তির ভিত্তি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
গ্রন্থটির অর্ধেকেরও বেশি অংশ জাতিব্যবস্থার ইতিহাস, উচ্চবর্ণীয় সমাজের কৌশল, ঔপনিবেশিক শাসনামলে শুরু হওয়া জনগণনা এবং জাতিগত শ্রেণিবিন্যাসের বিবরণে ব্যয়িত হয়েছে। এই তথ্যগুলির অধিকাংশই নতুন নয়। মনে হয়, লেখক তাঁর মূল আপত্তিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতেই এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক ভূমিকা নির্মাণ করেছেন। জাতি-উচ্ছেদ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সাম্য সম্পর্কে তিনি বইয়ের বিভিন্ন স্থানে নানা প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন; সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার দায় তিনি ব্রিটিশ সরকার এবং স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্র উভয়ের ওপরেই আরোপ করেছেন। অথচ সরকারগুলির ঠিক কী করা উচিত ছিল, কোন নীতির মাধ্যমে জাতিব্যবস্থার কাঠামো ভাঙা সম্ভব হতো, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্য সুস্পষ্ট নয়।
লেখকের মতে, ব্রিটিশ শাসকরা ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতির উদ্দেশ্যে ১৮৭১ সালে ভারতে জনগণনা শুরু করেছিল। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সমর্থনে তিনি পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ পেশ করেননি। এটি গবেষণাসিদ্ধ সিদ্ধান্তের চেয়ে অনুমাননির্ভর মন্তব্য বলেই বেশি মনে হয়। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, ১৮৫৭ সালের পর ভারতে ব্রিটিশ ক্ষমতা যথেষ্ট সুসংহত হয়ে গিয়েছিল; ফলে শাসন বজায় রাখার জন্য তাদের জাতিগত বিভাজনের বিশেষ প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কেবল সামরিক ক্ষমতার ওপর টিকে থাকে না; শাসিত সমাজকে শ্রেণিবদ্ধ করা, তার পরিচয়গুলিকে প্রশাসনিক বিভাগে রূপান্তর করা এবং জনগোষ্ঠীগুলির পারস্পরিক দূরত্বকে নীতির অংশ করে তোলাও সাম্রাজ্যবাদী শাসনের পরিচিত কৌশল। এই জটিলতাকে শুধু একটি বাক্যে অস্বীকার করা যায় না।
লেখক আরও অভিযোগ করেছেন যে, ভারতের সংবিধানসভা জাতিনির্মূলের জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেনি। অথচ সংবিধানসভা এর চেয়ে আরও কী করতে পারত, তিনি তার কোনও নির্দিষ্ট রূপরেখা দেননি। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, ড. বি. আর. আম্বেদকরের সঙ্গে সংবিধানসভায় তফসিলি জাতির আরও একত্রিশজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। অস্পৃশ্যতা বিলোপ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক সুরক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সংরক্ষণের নীতি, এই সমস্ত ব্যবস্থা এক ঐতিহাসিক সীমার মধ্যে জাতিভিত্তিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া নির্মাণ করেছিল। এগুলির সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আলোচনার বিষয়, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা বিচার করতে হলে বিকল্প প্রস্তাবও হাজির করতে হয়।
বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের জাতিভিত্তিক জনগণনা গ্রহণের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তেলতুম্বড়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এই উদ্যোগের মাধ্যমে জাতিগত পরিচয়কে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলা হবে। কিন্তু কেবল তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত থেকেই সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কতটা যুক্তিসঙ্গত, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়, বিশেষত যখন জাতপাত নির্বাচনী রাজনীতি, সামাজিক প্রতিনিধিত্ব এবং প্রশাসনিক সম্পদ বণ্টনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তবু সন্দেহকে প্রমাণে রূপান্তর করতে হলে কেবল রাজনৈতিক আশঙ্কা যথেষ্ট নয়।
ভারতে সংরক্ষণনীতি পঞ্চাশের দশকে যে কাঠামোর মধ্যে গড়ে উঠেছিল, ২০২৬ সাল পর্যন্ত সেই কাঠামো অপরিবর্তিতভাবে চলবে কি না, সেটিও আজ গুরুতর প্রশ্ন। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে সমাজের শ্রেণিগত অবস্থান, শিক্ষালাভের সুযোগ, পেশাগত গতিশীলতা এবং আঞ্চলিক বৈষম্যে বহু পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে সংরক্ষণনীতির কালোপযোগী পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই পুনর্বিন্যাস কোনও ধারণা বা নির্বাচনী সুবিধার ভিত্তিতে করা যায় না; তার জন্য প্রয়োজন জাতিভিত্তিক নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য। যে সমাজে রাষ্ট্রীয় সুযোগ, প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব এবং শিক্ষাগত প্রবেশাধিকার এখনও জাতিগত অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেখানে জাতি সম্পর্কে তথ্য না রাখা সমস্যাটিকে অদৃশ্য করে রাখারই সমান।
ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর ১৯৩১ সালের জনগণনার তথ্য ব্যবহার করেই মুম্বাই প্রাদেশিক আইনসভায় ‘অস্পৃশ্য’ জনগোষ্ঠীর জন্য নয়টি আসনের দাবি জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য তিনিও পরিসংখ্যানের প্রয়োজন স্বীকার করেছিলেন। ইতিহাসের এই দৃষ্টান্ত সামনে থাকার পরও জাতিভিত্তিক জনগণনার বিরোধিতা অনেকাংশে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। কারণ কোনও জনগোষ্ঠীর সংখ্যা, সামাজিক অবস্থান এবং সুযোগপ্রাপ্তির প্রকৃতি সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য ছাড়া বৈষম্যের প্রকৃত মাত্রা নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
গ্রন্থের শেষভাগে তেলতুম্বড়ে নিজেই জাতিভিত্তিক তথ্যের প্রয়োজনীয়তার দিকে পরোক্ষভাবে এগিয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন, নির্বিশেষ ও অভিন্ন সংরক্ষণনীতি স্বভাবতই সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর তুলনামূলকভাবে অগ্রসর ও সুবিধাজনক অংশের হাতে অধিক পরিমাণে দখল হয়ে যায়; এর ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেইসব মানুষ পদ্ধতিগতভাবে বাদ পড়ে, যাদের সংরক্ষণের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কারা সুবিধা পাচ্ছে, কারা ক্রমাগত বঞ্চিত থাকছে, কোন গোষ্ঠীর ভেতরে সম্পদ ও সুযোগের বণ্টন কী রূপ নিচ্ছে, এসব জানতে হলে বিস্তারিত জাতিগত তথ্য অপরিহার্য।
বস্তুত জাতিভিত্তিক জনগণনার মধ্যে বিপদের সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি সামাজিক ন্যায়বিচারের উপকরণে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তথ্যকে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, রাষ্ট্র সেই তথ্যের ভিত্তিতে কাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে এবং সংরক্ষণের সুফল গোষ্ঠীর ভেতরের অগ্রসর অংশে কেন্দ্রীভূত না রেখে প্রকৃত বঞ্চিতদের কাছে পৌঁছে দেবে কি না, মূল প্রশ্নগুলি সেখানে। জাতিকে অস্বীকার করলে জাতিব্যবস্থা বিলুপ্ত হয় না; বরং তার কার্যকর উপস্থিতি পরিসংখ্যানের অন্ধকারে আরও নিরাপদ হয়ে ওঠে। সুতরাং জাতিগণনার বিরোধিতা করতে হলে তার চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য কোনও সামাজিক পরিমাপের পদ্ধতি হাজির করতে হবে। তেলতুম্বড়ের গ্রন্থ সেই বিকল্পের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয় না। বরং তাঁর নিজের বিশ্লেষণই শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করে, ন্যায়সংগত সংরক্ষণনীতি এবং সবচেয়ে বঞ্চিত মানুষের শনাক্তকরণের জন্য জাতিভিত্তিক জনগণনা আজও প্রয়োজনীয়।
গ্রন্থ: দ্য কাস্ট কন সেন্সাস
লেখক: ড. আনন্দ তেলতুম্বড়ে
প্রকাশক: নবযান পাবলিশিং, দিল্লি
মূল্য: ৪৯৯ রুপি
পৃষ্ঠা: ২৫১




আপনার বিশ্লেষণধর্মী লেখাগুলো খুব সুন্দরভাবে সহজবোধ্য করে তোলেন। ধন্যবাদ আপনাকে।
বেশ স্পষ্ট বিশ্লেষণ। ভালো লেগেছে।ধন্যবাদ