বিশ্বকাপের ফুটবল, ক্ষমতা আর বদলে যাওয়া পৃথিবীর গল্প
চার বছর পরপর পৃথিবী হঠাৎ এক মাসের জন্য অন্যরকম হয়ে যায়। অফিসের ডেস্কে বসে থাকা মানুষ দুপুরবেলা ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখে, শহরের গলির দোকানে পতাকা ওঠে, বুয়েনস আইরেসের কোনো বারে অপরিচিত মানুষ একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে, ঢাকার কোনো ছাদে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা নিয়ে বন্ধুত্বে সাময়িক ফাটল ধরে, আফ্রিকার কোনো ছোট্ট গ্রামে শিশুরা পুরোনো বল নিয়ে নিজেদের মেসি বা এমবাপে ভাবে। পৃথিবীর এত ভাষা, এত ধর্ম, এত ইতিহাস, এত রাজনৈতিক বিভাজনের মাঝেও একটা চামড়ার বল কয়েক সপ্তাহের জন্য অদ্ভুত এক সাধারণ ভাষা তৈরি করে।
এই ভাষার সবচেয়ে বড় মঞ্চের নাম বিশ্বকাপ।
কিন্তু আজকের এই বিলিয়ন ডলারের বিশ্বকাপ জন্ম নিয়েছিল অনেক বেশি সাধারণ, অনেক বেশি এলোমেলো এক পৃথিবীতে। ১৯৩০ সালের জুলাই মাসে উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে যখন প্রথম বিশ্বকাপ শুরু হয়, তখন কেউ জানত না এই ছোট আয়োজন একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠবে। তখন ফুটবল ছিল অনেকটাই আধা-পেশাদার মানুষের খেলা। খেলোয়াড়রা আজকের তারকাদের মতো ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড ছিল না, তাদের পেছনে ছিল না বিশাল বিজ্ঞাপন সাম্রাজ্য, টেলিভিশনের কোটি কোটি চোখ, সোশ্যাল মিডিয়ার অবিরাম বিচারসভা। মাঠ ছিল অসমান, প্রস্তুতি ছিল অনিশ্চিত, অনেক দেশ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসতেই দ্বিধায় ছিল।
সেই ছোট্ট শুরু থেকে ফুটবল ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে বিশ্বায়নের আয়না।
সাইমন কুপার সেই পরিবর্তনের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। ইংরেজি ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া লেখকদের একজন হিসেবে তিনি ১৯৯০ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপ কাছ থেকে দেখেছেন। অনেক সাংবাদিক মাঠের স্কোর দেখেন, কে গোল করল, কে জিতল, কে হারল, সেই হিসাব রাখেন। কুপারের চোখ থাকে আরও দূরে। তিনি দেখেন স্টেডিয়ামের বাইরের রাস্তা, দর্শকের মুখ, পাবের আড্ডা, সরকারের স্বপ্ন, কর্পোরেট টাকার প্রবাহ, আর সেই সাধারণ মানুষদের যারা ফুটবলকে শুধু খেলা হিসেবে দেখে না, নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে ফেলে।
World Cup Fever সেই দীর্ঘ ভ্রমণের গল্প।
১৯৯০ সালের ইতালির বিশ্বকাপ দিয়ে তার যাত্রা শুরু। আজকের চোখে সেই টুর্নামেন্ট প্রায় অন্য যুগের ঘটনা মনে হয়। অনেক ম্যাচে গ্যালারির ফাঁকা আসন দেখা যেত, আয়োজনের মধ্যে ছিল ছোট শহরের মেলার মতো এক ধরনের সরলতা। ফুটবল তখনো পুরোপুরি বিনোদন শিল্পের হাতে চলে যায়নি। খেলোয়াড়রা বিখ্যাত ছিল, কিন্তু তারা এখনকার মতো পৃথিবীব্যাপী পণ্য ছিল না। একটা দেশের দল মানে তখনও অনেকাংশে সেই দেশের ফুটবল সংস্কৃতি, সেই দেশের রাস্তা, ক্লাব, শ্রমজীবী পাড়া, স্থানীয় স্মৃতি।
তারপর এল ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স।
ফরাসিদের ঘরের মাঠে জিনেদিন জিদানের নেতৃত্বে জয় শুধু একটা ট্রফির গল্প হয়ে থাকেনি। সেই দলকে দেখা হয়েছিল নতুন ফ্রান্সের প্রতীক হিসেবে। আলজেরীয় বংশোদ্ভূত জিদান, আফ্রিকান অভিবাসী পরিবারের সন্তানরা, ইউরোপীয় ঐতিহ্যের খেলোয়াড়রা মিলে তৈরি করেছিল এমন এক ছবি, যেখানে ফুটবল জাতীয় পরিচয়ের নতুন প্রশ্ন তুলেছিল। একটা দেশ আসলে কী? জন্মস্থান? রক্ত? পাসপোর্ট? ভাষা? নাকি একসঙ্গে দাঁড়িয়ে একই পতাকার নিচে আনন্দ করার ক্ষমতা?
কুপারের কাছে বিশ্বকাপের আসল গল্প এই জায়গাগুলোতেই।
২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ছিল আরেক ধরনের স্বপ্ন। নেলসন ম্যান্ডেলার দেশের জন্য এটা ছিল শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়, ইতিহাসের ক্ষত থেকে উঠে দাঁড়ানোর ঘোষণা। অ্যাপার্টহাইডের দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা পৃথিবীকে দেখাতে চেয়েছিল নতুন মুখ। স্টেডিয়ামে ভুভুজেলার শব্দের ভেতর ছিল শুধু উৎসব নয়, ছিল একটা জাতির নিজের গল্প নতুন করে লেখার চেষ্টা।
কিন্তু বিশ্বকাপ যত বড় হয়েছে, তার ছায়াও তত লম্বা হয়েছে।
আজকের ফুটবল শুধু মাঠের এগারো জন মানুষের খেলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বহুজাতিক কোম্পানি, সম্প্রচার অধিকার, বিলিয়ন ডলারের চুক্তি, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি তৈরির প্রকল্প, রাজনৈতিক ক্ষমতা। একটা সময় যে খেলা শ্রমিক শ্রেণির পাড়া থেকে উঠে এসেছিল, সেটাই এখন অনেক জায়গায় এমন এক শিল্প যেখানে সাধারণ সমর্থকের টিকিট কেনাও কঠিন হয়ে যায়।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ সেই নতুন যুগের সবচেয়ে জটিল উদাহরণ। ঝকঝকে স্টেডিয়াম, প্রযুক্তির প্রদর্শনী, অসাধারণ ফুটবল মুহূর্তের পাশাপাশি ছিল শ্রমিক অধিকার, মানবাধিকার, অর্থ আর ক্ষমতার কঠিন প্রশ্ন। ফুটবল আনন্দ দেয়, কিন্তু সেই আনন্দ তৈরির পেছনে কার শ্রম, কার মূল্য, কার গল্প চাপা পড়ে যায়, সেই প্রশ্নও থেকে যায়।
সাইমন কুপার ফুটবলকে রোমান্টিক চোখে দেখেন, কিন্তু অন্ধ ভক্তের মতো নয়। তিনি জানেন একটা গোল মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতির একটি হতে পারে। আবার সেই একই খেলাকে ব্যবহার করে ক্ষমতাবানরা নিজেদের গল্পও বিক্রি করতে পারে। ফুটবলের এই দ্বৈত চরিত্রই তাকে আকর্ষণ করে।
কারণ বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত শুধু কাপ জেতার ইতিহাস নয়।
এটা সেই আর্জেন্টাইন শিশুর গল্প যে মারাদোনার পুরোনো ভিডিও দেখে বড় হয়। সেই আফ্রিকান ছেলের গল্প যে ভাবে ফুটবল তাকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনবে। সেই বৃদ্ধ বাবার গল্প যে ছেলের সঙ্গে বসে শেষবারের মতো দেশের ম্যাচ দেখে। সেই অভিবাসীর গল্প যে নতুন দেশে থেকেও পুরোনো দেশের পতাকা বের করে। সেই শহরের গল্প যেখানে এক রাতের জয়ের পর হাজার মানুষ রাস্তায় নামে, যদিও পরদিন তাদের আবার একই চাকরি, একই বাস, একই জীবনে ফিরতে হবে।
নয়টি বিশ্বকাপের ভেতর দিয়ে কুপার আসলে দেখিয়েছেন গত তিন দশকে পৃথিবী কীভাবে বদলেছে।
ফুটবল পৃথিবীকে অনুসরণ করেছে, আবার অনেক সময় পৃথিবীও ফুটবলকে অনুসরণ করেছে। মাঠের ছোট ছোট পাস, ভুল, গোল, কান্না আর উল্লাসের মধ্যে জমা আছে বিশ্বায়নের ইতিহাস, অভিবাসনের ইতিহাস, অর্থনীতির ইতিহাস, মানুষের নিজের পরিচয় খোঁজার ইতিহাস।
শেষ বাঁশি বাজে, খেলোয়াড়রা মাঠ ছাড়ে, আলো নিভে যায়।
কিন্তু চার বছর পর আবার কোথাও একজন শিশু বল নিয়ে দাঁড়ায়।
আর পৃথিবী আবার বিশ্বাস করতে শুরু করে, হয়তো এবার তাদের পালা।



