বুকারজয়ী উপন্যাস ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ পাঠ
তাইওয়ানকে নিয়ে লেখা বহু উপন্যাস আছে, উপনিবেশবাদ নিয়েও অসংখ্য বই লেখা হয়েছে, কিন্তু ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ নিয়ে কথা বলতে গেলে শুরুতেই যে জিনিসটি আলাদা করে চোখে পড়ে, সেটি গল্পের কাহিনি নয়, বরং তার দেখার পদ্ধতি। বইটি পৃথিবীকে এমনভাবে ধরে রাখে যেন কেউ তাড়াহুড়ো করে জীবন পার করছে না, বরং হাতে খাতা-পেন্সিল নিয়ে বসেছে। কোথায় কোন বাটি bí-thai-bàk খাওয়া হলো, কোন kam-á-bit মুখে তোলা হলো, কে কোন লোককথা বলল, কারা বসে পাশা খেলল, সেসবের এত সূক্ষ্ম রেকর্ড রাখা হয়েছে যে পড়তে পড়তে মনে হয় আমরা উপন্যাস পড়ছি না, যেন এক ধরনের সাংস্কৃতিক মানচিত্রের ভেতর হাঁটছি। প্রতিটি খাবার, প্রতিটি উচ্চারণ, প্রতিটি ছোট সামাজিক আচার যেন শুধু বর্ণনা নয়, একটি সময়ের শরীর থেকে উঠে আসা তথ্য।
এই স্পষ্টতার ভেতরে আরেকটি স্তর যোগ করেছে বইটির ফুটনোটগুলো। সাধারণত সাহিত্য পাঠের সময় ফুটনোটকে অনেকে বিরক্তিকর বলে মনে করেন। বিশেষত মার্কিন ইংরেজিভাষী সাহিত্য-অনুবাদের পরিসরে ফুটনোটের প্রতি এক ধরনের অস্বস্তি আছে। মনে করা হয়, গল্পের প্রবাহ থেমে যায়, পাঠকের মনোযোগ ভেঙে যায়। কিন্তু এখানে ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে। লেখক ইয়াং শুয়াং-জি এবং ইংরেজি অনুবাদক লিন কিং ফুটনোটকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে সেটি গল্পের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাখ্যা নয়, গল্পের শরীরের অংশ হয়ে গেছে।
একটু কল্পনা করুন দৃশ্যটা। আপনি পড়ছেন একটি চরিত্রের কথা, সে কোনো খাবারের নাম বলল, বা একটি উচ্চারণ ব্যবহার করল, হঠাৎ নিচে ছোট্ট একটি নোট খুলে যাচ্ছে, সেখানে জানানো হচ্ছে এই শব্দের উৎস কোথায়, কোন ঐতিহাসিক সময়ে এর ব্যবহার কী ছিল, রোমানাইজেশনের কোন নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে, অথবা ভাষার ভেতরে কোন ক্ষমতার ইতিহাস লুকিয়ে আছে। মনে হয় কেউ আপনার পাশে বসে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলছে, “এটা শুধু একটা শব্দ না, এর পেছনেও একটা দেশ আছে, একটা ইতিহাস আছে।”
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ নিজেই একটা ছদ্মবেশের খেলা খেলে। মূলত এটি মান্দারিন ভাষায় লেখা একটি উপন্যাস, কিন্তু সেটি নিজেকে উপস্থাপন করে যেন এটি একটি জাপানি বইয়ের অনুবাদ। অর্থাৎ অনুবাদের ভান করছে একটি মূল বই। তারপর সেই ভানকে আরও জটিল করে তুলছে ফুটনোট, ভূমিকা, শেষকথা, নানারকম সম্পাদকীয় মন্তব্য, এমনকি কিছু কাল্পনিক প্যারাটেক্সচুয়াল উপাদানও। ফলে বইটি যেন এক ধরনের ক্যালাইডোস্কোপ হয়ে দাঁড়ায়। আপনি একটু ঘুরালেই ছবি বদলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখন বুঝলাম, পরের মুহূর্তেই বোঝা যাচ্ছে, না, বিষয়টা আরও জটিল।
এই ক্যালাইডোস্কোপের কেন্দ্রে রয়েছে দুই মানুষের সম্পর্ক। জাপানি ঔপন্যাসিক আওয়ামা চিজুকো ১৯৩৮ সালের তাইওয়ান সফরের বিবরণ লিখছেন। তখনকার তাইওয়ান ছিল সাম্রাজ্যবাদী জাপানের দক্ষিণমুখী সম্প্রসারণ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আওয়ামার সঙ্গে রয়েছেন তার দোভাষী, অং ছিয়ান-হক। তিনি স্নেহ করে তার নাম দেন “চি-চান”।
প্রথমে মনে হতে পারে এটি ভ্রমণের গল্প। একজন লেখক, একজন দোভাষী, অচেনা ভূখণ্ড, নতুন মানুষ। কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝা যায়, তাদের সম্পর্ক শুধু পেশাগত নয়। সেখানে টান আছে, আকর্ষণ আছে, এক ধরনের সংবেদনশীল ঘনিষ্ঠতা আছে। আওয়ামা চি-চানের চোখের দিকে তাকিয়ে “ঝিকমিক করা অন্ধকার” দেখতে পান। এমনকি তিনি বলেন, ফুলের বদলে যদি তীর নেমে আসত, তাহলে তিনি নিজের শরীর দিয়ে চি-চানকে রক্ষা করতেন।
এইসব বাক্য পড়তে পড়তে পাঠক কিছু সময়ের জন্য ভুলেও যেতে পারেন যে এই সম্পর্কের ভেতরে ক্ষমতার একটি বিশাল অসমতা কাজ করছে। কারণ আওয়ামা কেবল একজন নারী লেখক নন। তিনি সাম্রাজ্যের নাগরিক। আর চি-চান উপনিবেশের মানুষ।
উপন্যাসের শেষদিকে আওয়ামা একসময় বলেন, জাপানি সাম্রাজ্য এই দক্ষিণ দ্বীপে চমৎকার কিছু সৃষ্টি করছে, যেন অপরিশোধিত পাথরকে পালিশ করে জেড পাথরে পরিণত করছে। এই বাক্যটি পড়ে চমকে উঠতে হয়। কারণ এখানে ভালোবাসা আছে, প্রশংসা আছে, কিন্তু একই সঙ্গে এক ধরনের ঔপনিবেশিক দৃষ্টি কাজ করছে, যেখানে অন্যের ভূমি, অন্যের মানুষকে অপরিণত বলে ধরে নেওয়া হয়, যাদের “উন্নত” করা দরকার। আরও পরে আওয়ামা উপলব্ধি করেন যে তিনি কখনো সত্যিকারের অর্থে দ্বীপটিকে বুঝতে পারেননি, তাকে ভালোবাসেনওনি। এই উপলব্ধিটাই উপন্যাসটিকে আলাদা জায়গায় নিয়ে যায়। কারণ বইটি সরাসরি দাঁড়িয়ে বলে না যে, “উপনিবেশবাদ খারাপ।” কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যও দেয় না। বরং এটি দেখায় মানুষ কীভাবে ভালোবাসতে গিয়েও ক্ষমতার কাঠামো থেকে বের হতে পারে না। কীভাবে আন্তরিকতা থাকলেও দৃষ্টির মধ্যে সাম্রাজ্য লুকিয়ে থাকতে পারে। কীভাবে কারও জন্য সুরক্ষার ইচ্ছা, আরেকজনের ওপর অদৃশ্য কর্তৃত্বের রূপ নিতে পারে। এই জায়গায় ইয়াং শুয়াং-জির লেখার শক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আর লিন কিংয়ের অনুবাদ সেই শক্তিকে সাবধানে অন্য ভাষায় বহন করে নিয়ে যায়। কারণ এখানে শুধু ভাষা অনুবাদ হয়নি। অনুবাদ হয়েছে ইতিহাস, খাদ্য, উচ্চারণ, নীরবতা, ক্ষমতার সম্পর্ক, এমনকি ভুল বোঝাবুঝিও।
‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস অনেক সময় দুইজন মানুষের মাঝখানে বসে থাকে, খাবারের টেবিলে বসে থাকে, একটি শব্দের উচ্চারণে বসে থাকে, অথবা ফুটনোটের ছোট্ট অক্ষরের ভেতরে লুকিয়ে থাকে। আর আমরা যখন ভাবি আমরা শুধু গল্প পড়ছি, তখন হয়তো গল্পই আমাদের পড়ছে।




